প্রশ্নোত্তর ডিসেম্বর 2010

প্রশ্ন: পূর্বে অর্থের অভাবে আমার এবং আমার ছেলে-মেয়েদের আকীকা করা সম্ভব হয়নি। এখন আকীকা করা জরুরি কি না? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জানতে চাই। আব্দুল্লাহ কুয়েত উত্তর: অর্থাভাবের সমস্যা থাকলে ওলামায়েকেরামগণের মত হলো, ঋণ বা ধার করে হলেও আকীকা করবে, আশা করা যায় আল্লাহ তাকে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিবেন। তবুও যদি কেউ আকীকা করতে না পারে; তার জন্য পরবর্তীতে যে কোন সময় আকীকা করা জায়েয আছে, যদিও সেটা কয়েক বছর পর হোক না কেন। যখন আল্লাহ তাকে সামর্থ দিবেন তখনই আকীকা করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন; বিত্তবান নিজ সামর্থ অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা হতে ব্যয় করবে। (সূরা তালাক: ৭)

কোন কোন আলেম বলেন; নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার কারণে, সন্তান বয়প্রাপ্ত হলে আকীকা করার প্রয়োজন হয় না। অনেকের ধারণা যে, আকীকা না করা হলে কুরবানী কিংবা হজ্জ করা যায় না, ধারণাটি সঠিক নয়। হজ্জ বা কুরবানী ওয়াজিব হলে করতে হবে। সূত্র : ফতোয়া আব্দুল্লাহ বিন জিবরীন নং ৪৫

প্রশ্ন: আয়শা, খাদিজা, সুমাইয়া এবং রুকাইয়া নামের অর্থ জানতে চাই। ফিরোজ আহমদ কুয়েত

উত্তর: আয়শা অর্থ= জীবিত, সুখী জীবন যাপনকারিনী, রাসূলের একজন স্ত্রীর নাম। খাদিজা অর্থ = অসম্পূর্ণ, প্রথম মুসলমান নারী, রাসূলের প্রথমা স্ত্রী।
সুমাইয়া অর্থ = উঁচু, উচ্চ, সুউচ্চ, একই নামবিশিষ্ট, সমকক্ষ, সমতুল্য, সবমিয়া, ইসলামের প্রথমা শহীদা নারী। রুকাইয়া অর্থ = উন্নতশীলা, রাসূলের কনিষ্ঠা কন্যা।

প্রশ্ন: কোন গাড়ি কিংবা সি এনজি ক্রয় করে অন্যকে ভাড়ায় দিলাম। চুক্তি মোতাবেক সে আমাকে প্রতি দিন ৩০০ – ৫০০ টাকা করে দেবে। এ রকম চুক্তি ইসলামে জায়েয আছে কি না?

উত্তর: এই পদ্ধতিতে গাড়ী কিংবা সি এনজি অথবা অন্য যে কোন যান বাহন ভাড়ায় দেওয়া, জায়েয হওয়ার ব্যাপারে কেউ দ্বিমত পোষণ করেননি। এ ভাবে চুক্তি করে আপনি গাড়ী কিংবা সি এনজি ভাড়া দিতে পারবেন। (ফতোয়া শাবাকা ইসলামিয়া নং ৮৩১৬)

প্রশ্ন: অন্যের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করার বিধান জানতে চাই।

উত্তর: অন্যের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করতে হলে, ইদ্দতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পূর্বে বিয়ে করলে, বিয়ে শুদ্ধ হবে না।

প্রশ্ন: গরীবের উপর ফেতরা ওয়াজিব কি না? ফেতরা ওয়াজিব হওয়ার অর্থ-সম্পদের পরিমাণ জানতে চাই।

উত্তর: সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা প্রত্যেক মুসলমান (মুক্ত, দাস, পুরষ, মহিলা, ছোট, বড়, ধনি, গরীব) সবার উপর ফরয। এটা ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের মত। আর জমহুর ওলামায়ে কেরামগণ বলেছেন: ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার জন্য ঈদের দিন ও রাত এই পরিমাণ মালের মালিক হতে হবে যা তার পরিবারের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও খাবারের অভাব পূরণ করে।

হযরত মা‘মার যুহরী থেকে, তিনি আব্দুর রহমান আ‘রাজ থেকে, তিনি আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন: তিনি বলেন: সদকায়ে ফিতর প্রত্যেক স্বাধীন, পরাধীন পুরুষ, নারী, ছোট বড়, ধনী গরীব, নির্বিশেষে সকলের প্রতি এক সা‘ খেজুর, আধা সা‘ গম বা আটা পরিমাণ ওয়াজিব। (ত্বাহাবী {২-৪৫}ও মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাক বায়হাকী- ইমাম আহমদ বলেন; মা‘মারের বর্ণনা রাসূল (সাঃ) থেকে বর্ণিত এবং সনদ সহীহ ৭৭১০)

উল্লেখ্য সা‘ হলো একটি পরিমাপ যন্ত্রের নাম, যার পরিমাণ নিম্নরূপ:

কেউ বলেছেন: ২৭০০ গ্রাম (পৌনে তিন সের) কেউ বলেছেন: ২২৫০ গ্রাম (সোয়া দুই কেজি) কারও মতে ২২০ তোলা।
সুতরাং একজন সাধারণ গরীবেরও উচিত সদকায়ে ফিতর আদায় করে পূন্য অর্জন করা।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকায় মুসল্লিরা দাড়িয়ে দরূদ পড়ে থাকেন যাকে এক কথায় কিয়াম বলা হয়; যেমন ‘ইয়া নাবী সালামু আলাইকা ইয়া রাসূল সালামু আলাইকা’ এই রকম কিয়াম করার বিধান আমি কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে জানতে চাই।

উত্তর: বর্তমান সমাজে যে সব বিদ’আত প্রচলিত রয়েছে তা দু ধরনের:
এক. মৌলিক বিদ’আত: যে বিদ’আতে পদ্ধতি ও মৌলিক নব উদ্ভাবিত তাই মৌলিক বিদ’আত বলে খ্যাত। যেমন মাজার কেন্দ্রিক ওরশ।
দুই. পদ্ধতিগত বিদ’আত: আর যে বিদ’আতের মৌল কাজটি শরীয়ত সম্মত ইবাদত, কিন্তু পদ্ধতিটি সুন্নতের পরিপন্থী তা পদ্ধতিগত বিদ’আত। যেমন প্রচলিত মিলাদ এবং মিলাদে ইয়া নবী সালামু আলাইকুম বলে দাড়ানো। এ মিলাদের মৌলিক কাজ হলো নবীর উপর দুরুদ পাঠানো। কিন্তু বর্তমানে যে প্রচলিত নিয়মে মিলাদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় তা ইসলাম সম্মত নয়। যা নতুন আবিষ্কৃত বিষয় এবং তা পালন করা বিদ’আত। কাজেই এ মিলাদ পরিতাজ্য।
মিলাদের ইতিহাস
প্রচলিত মিলাদের প্রবর্তক হলেন, ইরাকের মুসল নগরীর শাসন কর্তা মুজ্জাফ্ফর উদ্দিন কুকুরী। মূলত তার নির্দেশে আবুল খাত্তাব উমর নামক জনৈক আলেম ৬০৪ সালে এর প্রচলন করেন। ইনি ইবনে দাহিয়া নামে সমধিক পরিচিত। এদের চরিত্র তেমন ভালো ছিল না। সুলতান মুজাফফর ছিলেন একজন অপব্যয়ী শাসক। রাষ্ট্রীয় অর্থ তিনি সীমাহীনভাবে খরচ করতেন। এই মিলাদ অনুষ্ঠান এর প্রসার ও প্রচলনে অঢেল অর্থ খরচ করতেন। এ ব্যাপরে ঐতিহাসিক যাহাবী বলেন তার মিলাদ মাহফিলের কাহিনী ভাষায় ব্যক্ত করার মত নয়। মিলাদ অনুষ্ঠানের যোগ দেবার জন্য ইরাকের প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে ও আল জেরিয়া হতে লোকের আগমন ঘটত। মিলাদের দিন তার ও তার স্ত্রীর জন্য সুরম্য কাঠের গম্বুজাকৃতির তাবু তৈরী করা হত। সেখানে গান বাজনা ও খেলা ধুলার আসর জমত। মুজাফফর প্রতিদিন আসরের পরে সেখানে আসতেন এবং অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন। অনুষ্ঠান কয়েক দিন যাবত চলত। অসংখ্য পশু জবাই করে আগত ব্যক্তিদের আহারের ব্যবস্থা করা হত। তিনি এ উপলক্ষে তিন লাখ দিনার বাজেট পেশ করতেন। ফকির দরবেশদের জন্য দু’লাখ এবং অতিথিদের জন্য এক লাখ দিনার। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা করেন, আমি দস্তরখানায় বিশেষ প্রজাতির একশত ঘোড়া, পাঁচ হাজার বকরীর মাথা, দশ হাজার মুরগি, এক লাখ গামলা, এবং তিন হাজার হালুয়ার পাত্র গণনা করেছি। এরপর ইমাম যাহাবী বলেন বিষয়টি আমার কাছে অবিশ্বাস বলে মনে হয়। কারণ এর দশ ভাগের এক ভাগও অনেক বেশি। এ ব্যাপরে ইমাম আহমদ বিন মুহাম্মাদ মিসরী বলেন তিনি বাদশা ছিলেন। সমকালীন উলামাদেরকে তিনি স্ব-স্ব ইজতেহাদ (গবেষণা) অনুযায়ী আমল করার নির্দেশ দিতেন। ইমামদের অনুসরণ করতে নিষেধ করতেন। ফলে এক শ্রেণীর আলেম সেদিকে ঝুকে পড়ে। তিনি রবিউল আওয়াল মাসে মিলাদ শরীফের আয়োজন করতেন। তিনিই প্রথম বাদশা যিনি মিলাদের প্রবর্তন করেন। (আল মিনহাজুল ওয়াজিহ ১৬২)
অতএব বুঝা গেল, প্রচলিত মিলাদের প্রবর্তক বাদশা মুজাফফর, ইসলামী বিধি বিধানের গুরুত্ব দিতেন না। গান বাজনায় লিপ্ত হতেন। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ করে মিলাদের আয়োজন করতেন। আলেমদেরকে প্রলোভন দিয়ে ইচ্ছা মত ব্যবহার করতেন।
অন্য দিকে যে আলেম প্রচলিত মিলাদ প্রবর্তনে সাহায্য করেন তার নাম মাজদুদ্দিন আবুল খাত্তাব উমার বিন হাসান বিন আলী বিন জমায়েল। তিনি নিজেকে সাহাবী দাহেয়াতুল কালবি এর বংশধর বলে দাবি করেন। অথচ তা ছিল মিথ্যা দাবি। কারণ দাহেয়াতুল কালবি (রা.) কোনো উত্তরাধিকারী ছিল না। তাছাড়া তার বংশ ধারায় মধ্যস্থ পূর্বপুরুষরা ধ্বংসের মধ্যে নিপাপিত হয়েছিল। তারপরেও তার বর্ণিত বংশ ধারায় অনেক পুরুষের উল্লেখ নাই। (মিজানুল ই‘তিদাল ১/১৮৬) এই সরকারি দরবারী আলেম একটি পুস্তক রচনা করেন। এই পুস্তকে মিলাদের রূপরেখা বর্ণনা করা হয়। ৬০৪ হিজরীতে শাসক মুজাফ্ফারকে পুস্তকটি উপহার দেন। এতে তিনি খুশি হয়ে তাকে দশ হাজার দিনার বখশিশ দেন। আর সে বছর হতেই তিনি মিলাদুন্নবী পালন করতে শুরু করেন। (টিকা সিয়ারু আলা মিননুবালা ১৫/২৭৪)
মিলাদ প্রথা আবিস্কারের পরে সে সময়ের মানুষ বছরে একটি দিনে (১২ রবিউল আউয়াল) তা পালন করত এবং তা কয়েকদিন ধরে চলত। পরবর্তীতে ভক্তরা এটাকে সাওয়াবের কাজ মনে করে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে পালন করতে শুরু করে। আগে বড় ধরনের মাহফিলের আয়জন করা হত। বর্তমান মনগড়া কিছু দুরুদ ও গজল গেয়ে শেষ করা হয়।
যে কয়েকটি কারণে মিলাদুন্নাবি বিদ‘আত; তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১. মিলাদুন নবী অর্থ নবী (সাঃ) এর জন্ম দিন। মহানবীর (সাঃ) জন্মদিন পালন করা যা বিজাতীয় সংস্কৃতি। যেমন হিন্দুরা শ্রী কৃষ্ণের, খৃষ্টনরা ঈসা (আঃ) জন্মদিন পালন করে।
২. রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ তার জন্য নির্ধারিত করা।
৩. ঐ দিনকে দরূদ পাঠের জন্য নির্দিষ্ট করা, যা রাসূল ও সাহাবাগণ এমনকি আইম্মায়ে মুজতাহেদীনগণের কেউ এমন আমল করেন নি।
৪. রাসূল (সাঃ)-এর আত্মা উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন, মনে করে দাড়ানো। এমনকি অনেক স্থানে রাসূল (সাঃ)’র জন্য একটি চেয়ারও রাখা হয়, এবং ধারণা করা হয় রাসূল (সাঃ) এই চেয়ারে বসেন।
কিয়াম
কিয়াম অর্থ দাড়ান। প্রচলিত মিলাদের সাথে আরও একটি প্রথা সংযোজিত হয়েছে। তা হল রাসূল (সা) এর সম্মানার্থে দাড়ান। এটি মৌলিক বিদ’আতের অন্তর্ভূক্ত। সম্পুর্ণ অপ্রাসাংগিক একটি বিষয় মিলাদের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এটি মিলাদের পরে আবিষ্কৃত হয়েছে। ৭৫১ হিজরির কথা। খাজা তকিউদ্দিন ছিলেন একজন ভাব কবি ও মাজযুব (ভাবাবেগে উদ্দেলিত) ব্যক্তি। মহানবী (সাঃ) এর নামে তিনি বিভিন্ন কাসিদা (গুণকীর্তণমূলক কবিতা) রচনা করেন। বরাবরের ন্যায় একদিন তিনি কাসিদা পাঠ করছিলেন। বসা থেকে ভাবাবেগে হঠাৎ তিনি দাঁড়িয়ে কাসিদা পাঠ করতে থাকলেন। ভক্তরাও তার দেখা দেখি দাঁড়িয়ে গেল। ব্যাস! ঘটনা এখানেই শেষ। তিনি আর কখনো এমনটি করেননি। এখানে একটা বিষয় লক্ষনীয় যে, খাজা তকিউদ্দিন কবিতা পাঠ করতে করতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। এটি কোন মিলাদের অনুষ্ঠান ছিল না। তিনি অনিচ্ছাকৃত দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু মিলাদের জন্মের একশত বছর পরে বিদ‘আতপন্থীরা এটিকে মিলাদের সাথে জুড়ে দেয়। ফলে কিয়াম বিশিষ্ট মিলাদ বিদ‘আত হওয়ার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে।
বস্তুত আমাদের দেশে এমন অনেক বিদ‘আত রয়েছে যা বুজুর্গদের বিশেষ মুহূর্তের আমল থেকে সৃষ্ট। সংশ্লিষ্ট বুজুর্গ কখনো তার ভক্তদের এসব করার নির্দেশ দেননি, অনুসারীরা অজ্ঞতাবশত এসব কাজ চালু করেছে।
দয়াময় প্রতিপালক সুহমান আল্লাহ আমাদেরকে যে কোন বিদআত থেকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সহীহ শুদ্ধভাবে দ্বীনী আমলের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের মহা কল্যাণ লাভের তাওফিক দান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *