“ইভটিজিং ও তার প্রতিকার”

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে ইভটিজিং শব্দটি সর্বাধিক আলোচিত। টিভির পর্দায়, দৈনিক বার্তার পাতায় ও ইন্টারনেটে, ব্লগ কিংবা ফেসবুকে প্রবেশ করলেই এই মহামারির ভয়াল চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। মিডিয়াতে দৃষ্টি দিলেই দেখা যায় ইভটিজিং এর প্রতিবাদ করায় ইভটিজারের হাতে শিক্ষকের মৃত্যু, (যৌন সন্ত্রাসের প্রথম শিকার ছাত্রীর শিক্ষক নাটোরের কলেজ শিক্ষক মিজানুর রহমান) মায়ের মৃত্যু, (যৌন সন্ত্রাসের দ্বিতীয় শিকার মেয়ের মা  গোপাল গঞ্জের চাঁপা রানী) আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যু (যৌন সন্ত্রাসের তৃতীয় শিকার কুরিগ্রামের ছাত্রীর বয়োবৃদ্ধ নানা) এবার যৌন সন্ত্রাসের শিকার দিনাজপুরের ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী শাবনুর। এ অপমান সইতে না পেরে শাবনুর ঘরে ফিরে রাতে ঘরের বর্গার সাথে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।
গেল ডিসেম্বর ২০১০ শুক্রবার ডেসটিনির কনসার্টের মাধ্যমে শাহরুখ খান প্রকাশ্যে চুমুর বৈধতা দিয়ে গেলেন। ভারতীয়দের নগ্ন কনসার্টের খবরে গত মাসে ইভটিজিং বেড়েছে। এবার পাবে নতুন মাত্রা।
ইভটিজিং ও নারী নির্যাতন
সারাদেশে ইভটিজিং ও নারী নির্যাতন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। নভেম্বর মাসে ইভটিজিংয়ের শিকার হওয়ার ২২৫টি ঘটনা পত্রিকায় এসেছে। এর মধ্যে ৩ জন তরুণী ইভটিজিং এর অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। ইভটিজিংয়ের ঘটনার প্রতিবাদ করায় প্রাণ দিতে হয় ৫ জনকে।
যার মধ্যে, ১ নভেম্বর বগুড়ার শেরপুরে ইভটিজিংয়ের অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে স্কুলছাত্রী রূপালী রানী (১৫) । ৪ নভেম্বর চট্টগ্রামে আটক ইভটিজারকে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয় তার বন্ধু-বান্ধবরা।
৬ নভেম্বর কুমিল্লায় পূজা অনুষ্ঠানে ইভটিজার ছোট ভাইয়ের পক্ষ নিলে গণপিটুনিতে নিহত হয় ছাত্রলীগ নেতা জাকির। এর জের ধরে পূজামণ্ডপ ভাঙচুর ও সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘরে হামলা করা হয়।
৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে বখাটেরা উত্যক্ত করলে তার প্রতিবাদ করায় ৬ সাংবাদিককে পিটিয়ে আহত করে ইভটিজার গ্রুপের লোকেরা।
৮ নভেম্বর কুমিল্লার মুরাদনগরে ইভটিজার ছেলের বখাটেপনা থামাতে না পেরে নিরূপায় হয়ে আত্মহত্যা করে এক অসহায় মা।
আসুন আজ আমরা “ইভটিজিং ও তার প্রতিকার”  নিয়ে একটি শুনি।
মেয়েটিকে কোচিং ক্লাশে বসিয়ে দিয়ে অভিভাবকদের বসার জায়গায় আসতেই নাঈম ভাবী বললেন, ‘ভাবী, সরকার একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘‘ইভটিজিং’’ বন্ধে কঠিন আইন হচ্ছে।’ আমি গুছিয়ে বসতে বসতে বললাম, ‘আইন হলেই যে ‘‘ইভটিজিং’’ বন্ধ হবে তা কি আপনার মনে হয়? এ বিষয়ে আমাদেরও কিছু করণীয় আছে। আজ পথে ঘাটে, মার্কেটে, শপিং সেণ্টারে এমনকি কলেজ-ভার্সিটিতেও মেয়েদের যে পোশাক-আশাক দেখা যায় তা তো চলচ্চিত্রের অভিনেত্রীদেরও হার মানিয়ে দেয়। আমাদের মেয়েদের পোশাক সংক্ষিপ্ত ও আঁটোসাঁটো হয়েছে। চাল-চলন ও অভিব্যক্তিতেও এমন অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে, যা যুবকদের আকৃষ্ট করে। অন্যদিকে যুবসমাজকে অধঃপতনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে অবাধ আকাশ-সংস্কৃতি। টিভি-ভিসিআর এবং সিডি-ইন্টারনেটের অশ্লীলতায় অনেক শিক্ষিত, ভদ্র, মুখচোরা যুবকও বখাটের মতো আচরণ করে বসে। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে শুধু আইন করে কি ইভটিজিং বন্ধ করা যাবে?’’ নিগার আপা বললেন, ‘আর সমস্যা তো শুধু ইভটিজিং নিয়ে নয়, এখন তো মেয়েরা ঘরে-বাইরে সব জায়গায় নির্যাতিত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও কি নিরাপদ? ক’দিন আগে ইডেন কলেজের যে ঘটনা সংবাদপত্রে এল তা তো এক কথায় রোমহর্ষক! সংবাদপত্রের উপর চোখ বুলালেই চোখে পড়বে নারীদের নিগৃহিত হওয়ার নানা ঘটনা। তরুণী-যুবতীদের হত্যা ও আত্মহত্যার মর্মান্তিক সব সংবাদ। আরো কত নীরব কান্না যে কত মেয়ের বুকে গুমড়ে মরছে তার খবর কে রাখে?’’ আমি বললাম, ‘‘ইসলাম শান্তির ধর্ম। পরিচ্ছন্ন ও চিরআধুনিক। এমন কোনো বিষয় নেই, যা আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অহীর মাধ্যমে জানাননি। আমরা যারা পবিত্র কুরআন পেয়েছি আমাদের পথ-নির্দেশক হিসেবে তাদের মতো সৌভাগ্যবান আর কে আছে? আমরা পর্দার হুকুমের মাধ্যমে সম্মানিত হয়েছি। যদিও সরকার এই পর্দা নিয়ে বাড়া-বাড়ি করছে…। প্রসংগক্রমে বলতে হয়; নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাতের মত পর্দার বিধানও নারী-পুরুষের উপর ফরয। পর্দা ফরয এ কথা পবিত্র কুরআন দ্বারা প্রমাণিত; আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণত: প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতু¯পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো আছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (সূরা নূর: ৩০-৩১)
এ বিধান মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই নর ও নারীর প্রকৃত সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। ইসলাম কখনো অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধক নয়। নারীদের স্বাধীনতার পথেও নয়। আমরা কি পারি না কুরআনের পথে চলে নিজেদের ইজ্জত-আব্রু হেফাযত করতে? পথেঘাটে যদি বের হতেই হয় তাহলে আল্লাহর হুকুম মেনে শরীয়ত মোতাবেক পর্দা করে বের হলে যুবসমাজ বিভ্রান্ত হবে না; বরং মেয়েদের লাঞ্ছিত করার পরিবর্তে সম্মান করতে শিখবে। নাঈম ভাবীসহ অন্যরাও প্রায় একই সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘আমাদের সমস্যা আমাদেরকেই সমাধান করতে হবে। আর তার পথ হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান মোতাবেক চলা।’ কথা বলতে বলতে সময় যে কীভাবে কেটে গেল তা বুঝতে পরিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই কোচিং শেষের ঘণ্টা বাজল। এখন মেয়ে-বোনকে নিয়ে সবাইকে ঘরে ফিরতে হবে পথের কঠিন বিপদের মধ্যে দিয়ে। জানিনা আবার আমরা কোন বখাটেদের খপ্পরে পরি?
মূল কথা হলো: এই ইভটিজিং থেকে মুক্তি পেতে হলে যেমনিভাবে দলমত নির্বিশেষে সরকারকে কঠোর হাতে ইভটিজারদের দমন করতে হবে, তেমনিভাবে প্রত্যেক অভিভাবকদেরও কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক জীবন পরিচালনা করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফিক দান করুন। আমীন ॥

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *