আপনার জিজ্ঞসার জবাব

প্রশ্ন: মানুষ মারা গেলে পরিবারের পক্ষ থেকে খাবারের বিশেষ আয়োজন করা হয়ে থাকে। যেমন ব্যক্তির মৃত্যুর তিন দিনের দিন শুকনো খাবার চিরা-মুড়ি ফল-মূল ইত্যাদি পাড়া-প্রতিবেশিদের মাঝে বিতরণ করা হয়। আবার চল্লিশতম দিনে বিশাল আয়োজন করা হয়; সেখানে গরীব-দুঃখী, পথিক, সমাজের সর্বস্তরের লোককে দাওয়াত দেয়া হয়। এই বিষয়টিও কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জানাবেন।
উত্তর: মৃত ব্যক্তির পরিবারের লোকজন মৃতব্যক্তিকে কেন্দ্র করে যে খাবারের আয়োজন করে, তা সুন্নত পরিপন্থি কাজ। আর যদি এই আয়োজন মৃত ব্যক্তির সম্পদ থেকে করা হয়, আর তার উত্তরাধিকারিদের কেউ অনুপস্থিত থাকে কিংবা নাবালেগ থাকে, তাদের অংশ থেকে খাবারের আয়োজন করা জায়েয নাই।
যে কোন আমলের ব্যাপারে সবর্দা রাসূলের অনুসরণ করা উচিত। কোন চিরচারিতভাবে সুন্নাতের খেলাপ যে আমল চলে আসছে সেগুলোর অনুসরণ করা ঠিক নয়। হ্যাঁ যদি মৃত ব্যক্তির পরিবারের আত্মীয়-স্বজনগণ খাবারের ব্যবস্থা করে, আর বড় ধরণের মিলন মেলা ছাড়া খাওয়া দাওয়া করা হয়, এতে কোন দোষ নেই। রাসূল (সাঃ) বলেছেন: তোমরা জা‘ফরের পরিবারের জন্য খাবারের ব্যবস্থা কর, কেননা তারা মৃত্যুর কারণে শোকাহত। (তিরমিযী হাসান)
এই হাদীস থেকে ওলামায়েকেরামগণ বলেন; যে মৃত ব্যক্তির পরিবারের জন্য প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়-স্বজনের উচিত খাবারের ব্যবস্থা করা। কিন্তু মৃত ব্যক্তির পরিবার অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা বিদআত। (ইসলাম ওয়েব ফতোয়া নম্বর: ৫৯৭৬৬)
তবে হ্যাঁ মৃত ব্যক্তির পরিবার যদি সাধারণভাবে সদকার খাবার তৈরী করে, কোন লোকসমাগমের আয়োজন না করে, তবে তা জায়েয। এমন খানায় সমাজের সর্বস্তরের লোক উপস্থিত হওয়া উচিত নয়। কারণ সদকার খানা সকলে খেতে পারে না। এই খানা একমাত্র ফকীর মিসকীনদের জন্যই তৈরী করা হয়েছে। কোন কোন মসজিদে মৃতের নামে দোয়ার আয়োজন করে মিষ্টান্নদ্রব্য বিতরণ করা হয়, এগুলো ঠিক নয়। এতে মসজিদের আদব রক্ষা করা সম্ভব হয় না, বরঞ্চ হৈচৈ শোরগোল হয়ে থাকে।
বর্তমান সমাজে প্রচলিত একটি শক্ত বিদ’আতী আমল হচ্ছে “কুলখানি বা চল্লিশা” কুলখানি বা চল্লিশা এমন এক কাজ, যা শুধু বিদ’আতই নয়; অন্য ধর্মের অনুকরণও। অথচ রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘যারা যে জাতির অনুসরণ করে তারা ওদের দলভুক্ত’ (আবু দাউদ)
আমাদের দেশের প্রায় সব এলাকাতেই এ অনুষ্ঠান বিভিন্ন নামে প্রচলিত আছে। এর প্রকৃত নাম আসলে “শ্রাদ্ধ “, যা হিন্দুদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান। হিন্দুরা জল বলে আর আমরা বলি পানি। এ যেন ঠিক তেমনি হিন্দুরা বলে শ্রাদ্ধ আর আমরা বলি কুলখানি বা চল্লিশা যিয়াফত। যে নামেই ডাকিনা কেন জিনিস একই। এ অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হিন্দুদের। এর সাথে ইসলামের সামান্যতম সম্পর্ক নেই। পুণ্যেরতো প্রশ্নই আসে না। রাসূল (সাঃ) এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমার মা মারা গেছেন। এখন তার জন্য আমি কী করব? রাসূল (সাঃ)  বললেন, তোমরা মায়ের জন্য দোয়া করো এবং তার আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার করো, তার ওয়াদাকৃত অসিয়ত থাকলে তা পূরণ করো, দেনা থাকলে পরিশোধ করো।
হযরত ওমর (রাঃ) এর মুত্যুর পর তার পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে ওমর দূরের এক বেদুইন পল্লীতে গেলেন বেশ কিছু উপঢৌকন নিয়ে এক বেদুইন সর্দারের কাছে। সর্দার চিনতে না পেরে বললেন, ‘কে বাবা তুমি?’; আবদুল্লাহ ইবনে ওমর সালাম দিয়ে বললেন, ‘আমি হযরত ওমর (রাঃ) এর পুত্র। ছোট বেলায় বাবার সাথে আপনার এখানে এসেছিলাম। বাবা মারা গেছেন। আপনি আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। বাবার হক আদায় করার জন্য আপনার কাছে এসেছি। বৃদ্ধ সর্দার আবদুল্লাহকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন এবং হযরত ওমর (রাঃ) এর জন্য দোআ করলেন। শুধু বাবা-মা নন, যেকোনো স্বজন মারা গেলে তার জন্যই এ আমল করা রাসূল (সাঃ) এর শিক্ষা। তিনি নিজেও স্ত্রী খাদীজা (রাঃ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর জন্য চোখের পানি ফেলে দোআ করতেন আর খাদীজা (রাঃ)-এর আত্মীয়-স্বজন এমনকি তাঁর বান্ধবীদেরও খোঁজ নিতেন, তাদের কাছে উপঢৌকন পাঠাতেন। এই আমল কি আমরা করি? বরং অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা মারা গেলে খালা-মামা ও চাচা-ফুফুদের সাথে আর সম্পর্কই থাকে না। স্ত্রী মারা গেলে শ্বশুর বাড়ির সাথে সব সম্পর্কই যেন চুকে যায়। রাসূল (সাঃ) যা করতে বলেছেন তা না করে ভিন্ন ধর্মের অনুকরণে এই যে কুলখানি বা চল্লিশার নামে আমরা শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করছি, এতে কোনো অবস্থাতেই সওয়াব হতে পারে না। এ অনুষ্ঠানে যেসব কাজ করা হয় তার সবকটিই বিদ’আত।
যেমন- ১. তিন দিনের দিন মিলাদের আয়োজন করা। ২. নির্দিষ্ট দিনে আনন্দভোজের মতো করে মানুষকে খাওয়ানো, যার মধ্যে বেপর্দার ছড়াছড়ি…
৩. টাকা দিয়ে কুরআন পড়ানো। এগুলো বিদ‘আতের অন্তর্ভূক্ত আর দ্বীনে প্রত্যেক বিদ’আতই গোমরাহী আর প্রত্যেক গোমরাহীর পরিণতিই হল জাহান্নাম…

প্রশ্ন: আমাদের দেশে শাবানের ১৫ তারিখের রাতে যেভাবে বিশেষ আমল এবং খাবারের আয়োজন করা হয় তা-কি ইসলাম ভিত্তিক? যেমন শাবানের প্রথম সপ্তায় মসজিদে মীলাদের আয়োজন করা হয়, আবার মোল্লা-মুন্সীদের দাওয়াত খাওয়ানোর ধুম পড়ে যায়। তাদের ধারণা এখন খাওয়াতে না পাড়লে বিরাট সাওয়াব থেকে বঞ্চিত থাকবো। বিষয়টি ইসলামের দৃষ্টিতে জানতে চাই।
উত্তর: আমাদের দেশে শাবানের ১৫ তারিখের রাতে যেভাবে বিশেষ আমল এবং খাবারের আয়োজন করা হয় ইসলাম ভিত্তিক নয়। এ দিবসকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোন খাবারের আয়োজন বা ইবাদত বন্দেগীর শরীয়ত সমর্থন করে না। এগুলো বিদআতের অন্তর্ভূক্ত। বিস্তারিত মাসিক আল-হুদা জুলাই ২০১০ সুন্নাত ও বিদআত মিশ্রিত বারাআত প্রবন্ধটি দেখতে পারেন।
প্রশ্ন: জনৈক ব্যক্তি স্বপরিবারে দেশের বাইরে বসবাস করেন। এ কারণে নিজের বাড়ি-ঘর ও জায়গা-জমিন দেখাশোনার জন্য একজন অমুসলিম (হিন্দু) ব্যক্তিকে থাকার জন্য জায়গা দিলেন। ওখানে হিন্দু ব্যক্তি তার ধর্মীয় সব ধরণের আচার অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে। এভাবে কোন হিন্দুকে মুসলমানের বাড়িতে থাকার জায়গা দেওয়া ইসলামে কতটুকু অনুমতি আছে?
উত্তর: বাড়ির মালিক দেশে থাকুক আর বিদেশেই থাকুক, কোন অবস্থাতাতেই অমুসলিম (মুশরিক/মূর্তিপূজক) ব্যক্তিকে কোন মুসলমানের পক্ষে তার বাড়িতে (হিন্দু ব্যক্তিকে) তার ধর্মীয় কোন ধরণের আচার অনুষ্ঠান পরিচালনা করার জন্যে অনুমতি দিতে পারবে না।  এই বিষয়টি আল্লাহর রাসূল স্পষ্ট করে গেছেন; আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মাধ্যমেই মক্কা বিজয়ের সময় কা‘বা শরীফের ভিতর থেকে  হুবল নামক প্রধান মূর্তিসহ তার আশপাশে স্থাপিত ৩৬০টি মূর্তি ধ্বংস করেন। এতেই প্রমাণিত হয় যে, কোন মুসলমানের বাড়িতে মূর্তি রাখা, এবং তার পূজা আর্চনা করা কোন মতেই জায়েয নয়।
প্রশ্ন: মুসলিম ব্যক্তি কোন অমুসলিমের বাড়িতে দাওয়াত গ্রহণ করে কোন প্রকারের খাদ্য-খাবার  খেতে পারে কিনা? বিষয়টি ইসলামের দৃষ্টিতে জানালে উপকৃত হতাম।
উত্তর: কুরআন শরীফে আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের অপবিত্র বলেছেন, কিন্তু এর দ্বারা বাহ্যিক অপবিত্রতাকে বুঝানো উদ্দেশ্য নয় বরং আত্মিক অপবিত্রতাকে বুঝানো হয়েছে। বাহ্যিক দিক দিয়ে তারা নাপাক বা অপবিত্র নয়, ফলে বাহ্যিক পবিত্রতার সাথে সম্পৃক্ত আহকামের ব্যাপারে বাতিনী অপবিত্রতার কারণে কোন পরিবর্তণ হবে না, সুতরাং কোন অমুসলিমের হাতের রান্নাকৃত খাবার ততক্ষণ পর্যন্ত খাওয়া জায়েয যতক্ষণ পর্যন্ত নাপাক কোন কিছু দেয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত না হওয়া যায়। আর যদি খাবারে অপবিত্র কোন কিছু মিশানোর ব্যাপারে নিশ্চিভাবে জানা থাকে, তখন তা সম্পূর্ণরূপে হারাম হবে। (ফাতওয়া আলমগীরী  ৫: ৩৪৭, ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪: ১১৫, ৪: ২৭০)

প্রশ্ন: মুসলমান কোন হিন্দুকে সাহায্য করতে পারবে কি? এবং মুসলামনকে যদি কোন হিন্দু হাদিয়া-উপঢৌকন পেশ করে, অথবা কোন মুসলমান হিন্দুকে হাদিয়া দেয়, এভাবে আদান-প্রদান জায়েয হবে কিনা?
উত্তর: হিন্দুদেরকে সাধারণভাবে দান করা যায়। বিশেষ করে হিন্দু (অসহায়) যদি কোন মুসলমানের প্রতিবেশী হয়, তখন তাকে প্রতিবেশীর হক হিসাবে সাহায্য সহযোগিতা করা যাবে। তার সাথে ভাল ব্যবহার করতে হবে, কোন প্রকার কষ্ট দেওয়া যাবে না। সাহায্য সহযোগিতার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিতে হবে। আর আপনার এই সাধারণ দান হয়ত তাকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করবে। রাসূলে কারীম (সাঃ) বলেছেন: জিবরাইল (আঃ) আমাকে সর্বদা প্রতিবেশীর হক আদায়ের প্রতি উপদেশ দিতেন; আমার মনে হতো যেন তাদেরকে উত্তরাধিকারী হিসাবে স্থির করবেন। (বুখারী ও মুসলিম) এই হিসাবে প্রতিবেশী যদি অমুসলিম হয়, তবুও তাকে তার হক আদায় করতে হবে।
এমনিভাবে এটাও শরীয়ত সম্মত যে প্রতিবেশী অমুসলিম বা হিন্দুকে (যারা মুসলমানদের বিরদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় না) দান করা যাবে।  এই মর্মে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন। (সূরা মুমতাহিনা: ৮)  বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে; আসমা বিনতে আবি বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত: হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় তাঁর ‘মা’ মুশরিকা অবস্থায় মদীনায় মেহমান হন, এবং তার নিকট সাহায্য চান। তখন তিনি রাসূলের নিকট অনুমতি চান, যে আমি কী তাকে সাহায্য করতে পারি? রাসূল (সাঃ) অনুমতি দিলেন। কিন্তু হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা যাবে না। তবে পরস্পরে বৈধ উপঢৌকন আদান প্রদান জায়েয।

প্রশ্ন: মসজিদের ভিতরে দুনিয়াবী কথা বার্তা বলা এবং সেই উদ্দেশ্যে মসজিদের মাইক ব্যবহার করা জায়েয কিনা? ইসলামের দৃষ্টিতে জানতে চাই। শফিকুল ইসলাম- কুয়েত
উত্তর: মসজিদ কেবল মাত্র ইবাদত বন্দেগী এবং দ্বীনি কাজের জন্যে। ইবাদত বন্দেগী ছাড়া সেখানে অন্য কোন দুনিয়াবী কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়া বা সেখানে এ ধরণের অন্য কোন কাজ করা কিংবা অনর্থক দুনিয়াবী কথা বার্তা বলা না জায়েয।
মসজিদের ওয়াক্ফকৃত মাইক শুধু মাত্র মসজিদের ভিতর ধর্মীয় প্রোগ্রাম যথা- নামায, খোৎবা, ওয়াজ নসিহত, তাফসীর ইত্যাদির প্রচার ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ের ঘোষণা করার জন্য ব্যবহার করা জায়েয নয়।  (ফাতওয়া শামী ১: ৬৬২, ফাতাওয়া আলমগীরী ৫: ৩২১, আদদুররল মুখতার ৪:৪৩৩ )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *