রমযান মাসের প্রস্তুতি লগ্নে কিছু পরামর্শ

রমযান মাসের প্রস্তুতি লগ্নে কিছু পরামর্শ বা পরিকল্পনা
রমযান মাসের প্রস্তুতি লগ্নে কিছু পরামর্শ বা পরিকল্পনা

সংকলণে: মাওলানা মামুনুর রশীদ
রমযান মাসকে সামনে রেখে আপনাদের সামনে কিছু পরিকল্পনা তুলে ধরলাম। এর সাথে আপনারাও আরো কিছু করণীয় যোগ করে নিতে পারেন। আল্লাহ আমাদের হিম্মত বাড়িয়ে দিন ও আমল করার তৌফিক দিন:
গোটা মানব জাতির মধ্যে নবী (সা.) সবচেয়ে দানশীল ছিলেন। রমযান মাসে জিবরাঈল (আ:) যে সময় তাঁর সাথে সাক্ষাত করতেন সে সময় তিনি সবচেয়ে বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন। জিবরাঈল (আ.) রমযান মাসে প্রতি রাতেই তাঁর সাথে সাক্ষাত করতেন। এভাবেই রমযান মাস অতিবাহিত হত। নবী (সা.) (এ সময়) তার সামনে কুরআন শরীফ পড়ে শুনাতেন। যখন জিবরাঈল (আ.) তাঁর সাথে সাক্ষাত করতেন তখন তিনি গতিবান বায়ুর চাইতেও বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন। (বুখারী, কিতাবুস সাওম: ১৭৬৭)
আমরা এই হাদীস থেকে জানলাম যে নবী (সা.) রমযান মাসে  বেশি বেশি দান করতেন এবং কুরআন তেলাওয়াত করতেন।
প্রিয় পাঠক! আমারাও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করি যেন মহিমান্বিত এই মাসটি কুরআন তেলাওয়াত, কুরআনের দারস, ইসলামী সাহিত্যসহ মাসায়েল শিক্ষা ও দান খয়রাত এবং ইবাদত বন্দেগীতে কাটাতে পারি। এখন থেকে সেভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
১।  কুর’আন পুরোটা অর্থসহ পড়া: যারা খতম তারাবীতে যাবেন তাদের জন্য, দিনের বেলা সেই রাতের তারাবীতে পড়াবে এমন কুর’আনের অংশটুকুর অর্থসহ বুঝে পড়া, প্রয়োজনে তাফসীরসহ পড়ে নেওয়া। এখানে তেলাওয়াতকৃত আয়াতগুলো হতে বিষয় ভিত্তিক আয়াতগুলো, দারস তৈরি করার চেষ্টা করা। যারা আগ্রহী তারা মার্কার পেন বা কলম দিয়ে দাগিয়ে পড়তে পারেন অথবা ডায়রীতে লিখে নিতে পারেন কোনো কোনো আয়াত বিষয় ভিত্তিক।
এখানে আরেকটু করা যায়, এই সময়ে সমগ্র কুরআনের আল্লাহর শেখানো দোয়াগুলো আমরা ডায়রীতে তুলে ফেলে ধীরে ধীরে সেগুলো মুখস্ত করতে পারি।
প্রতি সূরা শেষ করে পরিবারের সবাইকে কিংবা নিজের শাখা বা অঞ্চলের দ্বীনি ভাইদের নিয়ে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো আলোচনা করা।
২।  সহীহ হাদীসগুলো ধীরে ধীরে জানা: তেমনিভাবে সহীহ বুখারী-মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থের সহীহ হাদীসগুলো থেকে উক্ত দিন গুলোতে নামায, রোযা, যাকাত বা দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কিত প্রতিদিন কমপক্ষে একটি হাদীস পড়া।
৩।   জীবনী থেকে উদাহরণ: রাসূলের জীবনী-মহিলা সাহাবী অথবা সাহাবা চরিত ভালো করে জানার সঙ্গে সঙ্গে সালফে সালেহীনদের জীবনী আমাল করার পদ্ধতি জানার চেষ্টা করা।
৪।  নামায: প্রতি পাঁচ ওয়াক্তের সাথে রাতে তারাবীহ, তাহাজ্জুদ ও দিনের বিভিন্ন নফল নামায পড়ার চেষ্টা করা। এই সময়ে আমরা সবাই সেহরীতে উঠি, একটু আগে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে এর উপকারিতা লাভ করতে পারি।  প্রতিদিনই তারাবীহ যেন আদায় করি। আল্লাহ তা’লা বলেন: তাদের পার্শ্বদেহ বিছানা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের প্রভূকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তা থেকে খরচ করে।’ (সিজদা : ১৬)
আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র এরশাদ করেন: ‘যে ব্যক্তি রাতের বেলা সিজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে ইবাদত করে, পরকালকে ভয় করে এবং তার রবের রহমত প্রত্যাশা করে (সে কি তার সমান যে এরূপ করে না)।’ (৯: যুমার)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত রাত্রে জাগতেন ও নামায আদায় করতেন। এ প্রসঙ্গে আয়শা রা. বলেছেন :‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের বেলায় নামাযে (এত দীর্ঘ সময়) দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তার পা দু’টো  যেন ফেটে যেত। আমি তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এমনটি করছেন কেন? অথচ আপনার পূর্ব ও পরের সব গুনাহ মাফ হয়ে গিয়েছে। তিনি বললেন, ‘আমি কি (আল্লাহর) কৃতজ্ঞ বান্দাহ হব না?’ (বুখারী ও মুসলিম)
আবদুল্লাহ ইবন সালাম থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘হে লোকসকল! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কর এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামায পড়। (এগুলো করে) তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ কর।’ (তিরমিযী)
আবু হুরাইরা (রা.)  থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘আল্লাহ করুণা করুন ঐ ব্যক্তির উপর, যে রাতে উঠে নামায পড়ে এবং তার স্ত্রীকে জাগিয়ে দেয়। স্ত্রী যদি উঠতে না চায় তাহলে তার মুখমন্ডলে পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ করুণা করুন ঐ নারীর প্রতি, যে রাতে উঠে নামায পড়ে এবং তার স্বামীকে জাগিয়ে দেয়। স্বামী যদি উঠেতে না চায় তাহলে তার মুখমন্ডলে পানি ছিটিয়ে দেয়।’ (আবু দাউদ)
‘রাসূল (সা.) বলেছেন: বান্দার কাছ থেকে কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে বিষয়ের হিসেব গ্রহণ করা হবে তা হলো তার নামায। সে যদি তা পুরোপুরিভাবে আদায় করে থাকে তবে তা পুরো লেখা হবে। আর সে যদি তা পুরোপুরি আদায় না করে, তবে মহান ও পরাক্রান্ত আল্লাহ ফেরেশ্তাদেরকে বলবেন: “দেখো, আমার বান্দাহর কোন নফল নামায আছে কি না, যা দিয়ে তোমরা তার ফরয পুরো করে নিতে পারো।’ (আবু দাউদ)
আমাদের প্রয়োজন নামাযে পঠিত সব সূরা ও তাসবীহ দরূদ অন্যান্য যা পড়ি তা এখন থেকে আবার সুন্দর সহীহ ও অর্থগুলো জানার কাজ শুরু করা।
৫। যিকর–এ ছাড়া বাকী সময়গুলো সব সময় আল্লাহর যিকিরে নিজের জিহবাকে সিক্ত রাখা, যেমন রান্না বা অন্য কাজের সময় দোয়া এস্তেগফার দরূদ পড়া।
৬। দান:  এ সময় নিকটাত্মীয় গরীব, মিসকীন, ফকীর এদের মাঝে সাহায্য বাড়ানো। নিজের ঘরের যে অধিনস্ত লোক থাকে কাজের জন্য তাকেও সাহায্য করা।
৭। প্রতিদিনই কাউকে ইফতার করানো:  একটি খেজুর কিংবা একটি লেবেন বা জুস দিয়ে হলেও। গরীব আত্মীয়দের বাসায় উপহার হিসাবে ইফতারের কিছু কাঁচা মাল (খেজুর, ছোলা, মুড়ি) আগেই পাঠিয়ে দেয়া। আর ধনীদের মাঝে ইসলামের শিক্ষার জন্য বই উপহার দেয়া বা কিনতে উৎসাহিত করা। পরিবারের সবাই মিলে ইফতারের আয়োজন করা। হালকা করে ইফতারের আগের সময়টুকু কুরআন তেলওয়াত ও দোয়ায় নিজেকে ব্যস্ত রাখা এবং পরিবারের সবাইকে নিয়ে ইফতার সামনে রেখে একসাথে আল্লাহর কাছে দোয়া করা।
৮। রোযাতে অধীনস্ত কাজের লোকদের কাজ হালকা করে দেয়া: এবং তাদেরকেও ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞান দান করা। এবং নিজে যা খাবে চাকর-বাকরকেও তাই খেতে দিবে।
৯।  নাবালক অর্থাৎ ছোটদেরকে মাঝে মধ্যে রোযা রাখার অভ্যাস করা।
১০। সংশোধন: নিজের দোষগুলো বের করে একটি একটি করে সেগুলো থেকে সরে আসা এবং তওবা করে আল্লাহর বিধান পালনে যত্নশীল হওয়া।
১১। দোয়া করা: রমযান মাসের প্রতি দিন ও রাতে আল্লাহ দোয়া কবুল করেন, তাই আমাদের রমযানের পূর্বে প্রত্যেক দিন নির্দিষ্ট করে দোয়া করা।
১২। শবে-ক্বদরের রাতগুলো (শেষ দশদিনের বেজোড় রাত) বিশেষভাবে রাত জেগে এবাদত করা।
১৩।  ইতেকাফ: শেষ দশদিনে ই’তেকাফে বসার সুযোগ করা ।
১৪। ঈদের ছালাতের পূর্বেই সঠিক সময়ে ফিতরা আদায় করা।
১৫। যাকাত সঠিক হিসাবে ও সঠিক পদ্ধতিতে আদায় করা।
পরিশেষে বলবো, আসুন আমরা রমযান মাসের মর্যাদা রক্ষা করি এবং রাসূল (সা.)-এর বলে দেওয়া নিয়মে এই মাসে ইবাদত বন্দেগী করি। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের সকলকে সেই তাওফীক ও শক্তি দান কর। আমীন।

হাদীসের আলোকে শাবান মাসে করণীয়

হাদীসের আলোকে শাবান মাসে করণীয়
হাদীসের আলোকে শাবান মাসে করণীয়

চান্দ্র মাসের অষ্টম মাস পবিত্র শা’বান মাস। এ মাস হাদীসের আলোকে একটি ফযীলত ও তাৎপর্যপূর্ণ মাস। মুসলিম উম্মাহর জন্য এ মাসে কিছু করণীয় রয়েছে; যা সংক্ষেপে নিচে আলোচনা কর হলোঃ
১. দুআ করা: অর্থাৎ শা’বান মাসে কিংবা তারো আগ থেকেই রমযানের বরকত পাওয়ার জন্য আল্লাহর সমীপে দোয়া করা, মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে রমযানের বরকত পাওয়ার তাওফীক দান করেন। সালফে সালেহীন বা পূর্বসূরীগণ রমযান মাস আগমনের ছয় মাস পূর্ব থেকে রমযানের বরকতের জন্য দোয়া করতেন, এবং রমযানের পরেও আরো ছয় মাস দোয়া করতেন, যেন রমযান মাসে কৃত আমল আল্লাহ কবুল করেন।
২. সাভাবিকভাবে সকল ইবাদতই করা: যেমন এর পূর্বের মাস গুলোতে করা হয়েছে, তেমনি তা এ মাসেও করাতে শরীয়তের কোন নিষেধাজ্ঞা নেই  শুধুমাত্র মধ্য শা’বানের পর হতে সিয়াম পালন ব্যতীত।  কারণ রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন “শা’বান মাস অধের্ক হয় গেলে তোমরা আর রোযা রেখ না।  (মুসনাদ আহমাদ (২/৪৪২), আবু দাউদ)
৩. হিজরী মাসের হিসাব রাখা: এই যুগে তো হিজরী মাসের হিসাব রাখার লোকের খুবই অভাব। ইংরেজি তারিখের হিসাব সকলেই জানি। কিন্তু স্মরণ রাখা দরকার যে, ইসলামের সকল আমলই হিজরী বা চান্দ্র মাসের হিসেবে হয়ে থাকে। তাই শা’বানের দিন, তারিখ গণনা করা দরকার, যেন রমযান মাসের শুরুটা সঠিকভাবে অনুধাবন করা যায়। এবং রমযানের বরকত হাসিল করা যায়। রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। রমযানে অধিক ইবাদতের জন্য সময়-সুযোগ বের করতেন। মানসিকভাবে তৈরি হতেন। আর এ কারণেই তিনি পবিত্র শা’বানের দিন, তারিখ গুরুত্বসহকারে হিসাব রাখতেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন; রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শা’বানের (দিন, তারিখ হিসাবের) প্রতি এত অধিক লক্ষ্য রাখতেন যা অন্য কোনো মাসের ক্ষেত্রে রাখতেন না। (সুনানে আবু দাউদ ১/৩১৮)
৪. বেশি বেশি নফল রোযা রাখা:  শা’বান মাসে অধিকহারে নফল রোযা রাখা উত্তম। এ প্রসঙ্গে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। উম্মে সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন; আমি নবী করিম সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শা’বান ও রমযান ব্যতীত দুই মাস একাধারে রোযা রাখতে দেখিনি। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন; আমি নবী করিম সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শা’বান মাসের মত এত অধিক (নফল) রোযা রাখতে আর দেখিনি। এ মাসের অল্প কিছুদিন ব্যতীত বরং বলতে গেলে পুরো মাসটাই তিনি নফল রোযা রাখতেন। (জা‘মে তিরমিযী ১/১৫৫)।
তবে খুবই লক্ষ্য রাখতে হবে যে, ১৫ই শা’বান দিনে রোযা ও পূর্বের রাতকে বিশেষ গুরুত দিয়ে আমল করার ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস পাওয়া যায় না। তাই যারা অন্যান্য দিন বা রাতে নফল ইবাদত করেন না, তাদের জন্য শুধু এই রাতকে নির্দিষ্ট করে ইবাদত করা বিদআত হবে। কেননা রাসূল (সা.) হতে  মধ্য শা’বানের ফযীলত সম্পর্কে এবং একটি রোযা রাখার স্বপক্ষে রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে  কোন সহীহ বা মারফু কিংবা মুত্তাসিল হাদীস বর্ণিত হয়নি।
৫. যারা প্রতি মাসে “আইয়ামে বীয” এর তিন দিন অর্থাৎ ১৩, ১৪ ও ১৫ তারীখে নফল সিয়ামে অভ্যস্ত তারা এ মাসেও উক্ত নিয়তেই সিয়াম পালন করবেন।
৬. যারা প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার নফল সিয়ামে অভ্যস্ত তারা এ মাসেও উক্ত দিনগুলিতে সিয়াম পালন করবেন  যদিও তা কখনও ভাগ্যক্রমে ১৫ শাবান হলেও তা বিদআত হিসেবে গণ্য হবে না, যদি তা শবে বরাতের নিয়তে পালন না করা হয়।
৭. মানতের সিয়াম: কেউ যদি বৈধ কোন কাজ সম্পাদনের জন্য মানত করেন, তিনি শা’বানের পনের তারিখে মানতের নিয়তে রোযা রাখতে পারবেন।
৮. ক্বাযা সিয়াম আদায় করা:  আবু সালামা রায়িযাল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে বলতে শুনেছি, আমার রমযানের কিছু রোযা বাকি থাকত। সেগুলো আমি শা’বান ছাড়া কাযা করতে পারতাম না  (বুখারী, মুসলিম) ইয়াহইয়া বলেন: এর কারণ ছিল তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেবায় ব্যস্ত থাকতেন।)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে বিদয়াত মুক্ত ইবাদত করার তাওফীক দান করুন। আমীন ॥

মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে?

মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে?
মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে?

 রহিম সাহেব বেসরকারী একটি অফিসের কর্মকর্তা। নয়টা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত অফিস করে অভ্যস্ত। পাঁচটার পর যথারীতি অফিসের কাজ গুটিয়ে হটপটটি কাঁধে ঝুলিয়ে বাসা অভিমুখে রওনা হলেন। দোতলা ভলভো সার্ভিসের অপেক্ষায় আছেন কাউন্টারের সামনের সারিতে। আচমকা পেছন থেকে একটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলেন। জামা-প্যান্ট ধূলি-ধূসর হয়ে গেল। পেছন ফিরে যেসব শব্দ বা বাক্য তিনি সজোরে উচ্চারণ করলেন, তা সাধারণত কেউই শুনতে চায় না। আর শোনার পর নিস্ক্রিয় থাকে না। ভলভোয় একটু ভদ্রগোছের মধ্যবিত্তরাই চড়ে। তাই কেউই তার অভদ্র শব্দগুলোর জবাব দিল না। ঝগড়াটে মানুষ ঝগড়া করতে না পারলে স্বস্তি পায় না। মনের পোটে প্রাণীটি ভেতরেই রয়ে গেল। অবশেষে বাসায় ফেরার পর বৌয়ের হাতে হটপটটি দেয়ার সময় প্রাণীটি বেরিয়ে এলোঃ
কী ছাইপাঁশ রান্না করো আজকাল, এসব কি খাওয়া যায়? সারাদিনে সামান্য একটু রান্না করবে-তারও এই হাল যত্তোসব। বারেক, বাসু ওরা কোথায়?
বৌঃ নিরুত্তরই থাকলো। কোন কথাই বললো না।
রহিম সাহেব বললো : কথা কানে যায় না?   কোথায় ওরা এদিকে বৌ কাঁদতে কাঁদতে অন্দরে চলে গেল। তার ছেলে দুটি মায়ের রুমে আজ্রাইলের ভয়ে চুপটি মেরে পড়ে আছে। এদিকে বাসায় রহিম সাহেবের বন্ধু এলেন হঠাৎ করেই। তিনি রহিম সাহেবকে তার কূশলাদি জিজ্ঞেস করার সাথে সাথেই জবাব দিলেন, ভালো আর থাকলাম কই, ঘরে-বাইরে সব খানেই অশান্তি আর অশান্তি। তোর ভাবীকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করলাম ছেলেপুলেগুলো কোথায়, সে তার মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। দুই বন্ধুর এরকম কথাবার্তার মাঝে রহিম সাহেবের স্ত্রী মেহমানকে সালাম দিয়ে ড্রইংরুমে এলেন। পারস্পরিক কূশল বিনিময়ের পর ভদ্র মহিলা চা আনার কথা বলে ভেতরে যাচ্ছিলেন, এমন সময় রহিম সাহেব টিপ্পনি কেটে বললেন, তোমার যেই চা, ও আর খাওয়া লাগবে না। বরং ফল-টল কিছু দাও। রহিম সাহেবের স্ত্রী লজ্জিত হয়ে অন্দর মহলে চলে গেলেন। এবারে আসুন ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। প্রতিটি মানুষেরই আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব রয়েছে, আত্মমর্যাদা রয়েছে। মর্যাদা এমন একটি ব্যাপার, যা অনেকের কাছেই সম্পদের চেয়েও মূল্যবান। নিকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারীরাই কেবল ধন-সম্পদের লোভে মর্যাদা বা ব্যক্তিত্বকেও বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কিন্তু যারা সৎ তারা মর্যাদাকে সব কিছুর উপরে স্থান দেয়। নারীরা স্বভাবতই লজ্জাবতী। সৎ নারীদের কাছে অর্থাৎ লজ্জাশীলা নারীদের কাছে মর্যাদার গুরুত্ব বেশি। স্ত্রীরাও স্বামীদের কাছে একইভাবে মর্যাদা পেতে আশা করে। স্বামীরা যদি তাদেরকে অমর্যাদা কিংবা অপমানিত করে, তাহলে তারা ভীষণ আহত হয়। আর স্ত্রীদের অর্থাৎ নারীদের অনেকেরই স্বভাব হলো, আহত হলেও তা প্রকাশ না করা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তুষের আগুনের মতো ধিকি ধিকি সে আহত হবার বেদনা লালন করতে থাকে। ধীরে ধীরে স্বামীর ব্যাপারে নিস্পৃহ মনোভাব দেখা দেয় এবং ঘৃণা করতে শুরু করে। অথচ স্ত্রী হলো আপনার জীবনসঙ্গিনী, আপনার সেরা বন্ধু, আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষ। ফলে সে-ই আপনার কাছ থেকে বন্ধুত্বের শ্রেষ্ঠ মর্যাদা পাবার অধিকার রাখে। স্ত্রীকে সম্মান করলে তা প্রেম-ভালোবাসায় পরিণত হয়। ফলে স্ত্রীও আপনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুরক্ত হয়ে পড়বে। এই সম্মান বা মর্যাদা প্রদর্শনের ব্যাপারটি কিন্তু আলাদা কোন আনুষ্ঠানিকতার মতো ঘটনা নয়। বরং উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে সকল কাজে কর্মেই সম্মান প্রদর্শন করা যেতে পারে। যখন বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন, স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিন। অফিসে এসে কাজের ফাঁকে খোঁজ নিন। বাসায় ফেরার পর দরজা খুলতেই তার আগে আপনিই সালাম দিন। সারাদিন কেমন কাটলো, খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হলো কিনা, সন্তানেরা জ্বালাতন করলো কিনা, এসব খোঁজ-খবর নিন। তারপর যতোক্ষণ একত্রে বাসায় থাকেন, সন্তানদের দেখাশোনার দায়-দায়িত্ব পালনে নিজেও অংশ নিন। স্ত্রী আপনাকে নিষেধ করলে আপনি বলুন সারাদিন তো তুমিই জ্বালাতন সহ্য কর। তার খানিকটা আমাকেও নিতে দাও। আপনার স্ত্রী এতে কৃতজ্ঞতায় বিনয়ী হয়ে উঠবে। খাওয়া-দাওয়া করতে বসলেন-তার রান্নাবান্নার প্রশংসা করুন। ঠাট্টা-মশকরা করেও স্ত্রীকে বিদ্রুপ করা বা অসম্মানিত করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন। কারণ আপনি ভালোবেসেই যে ঠাট্টা করেছেন এটা সে বুঝবে। সেজন্যে হয়তো কিছু মনে করবে না। তবে মনে মনে হয়তো ঠাট্টাটিকে সে অপছন্দই করতে পারে। কী প্রয়োজন ঠাট্টার পরিবর্তে বরং প্রশংসার কাব্যিক পথ বেছে নিন। মজা যদি করতেই হয়, তাহলে এমন ধরনের রসিকতা করুন, যাতে মজাও পাওয়া যায় আবার সম্মান-মর্যাদায়ও আঘাত না লাগে। কোন মজলিসে কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের সমাবেশে কখনই স্ত্রীকে খাটো করে বা অমর্যাদা করে কথা বলবেন না। বরং তাকে সম্মান দিয়ে তাকে প্রশংসা করুন। এতে আপনার বন্ধু মহলেও আপনার স্ত্রীর সম্মান-মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। যার ফলে আপনারা দুজনেই সম্মানিত হবেন। আর পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক দৃঢ় হয়। সেইসাথে দাম্পত্য জীবন ও পরিবারে সুখ-শান্তি ও সৌরভময় এক পরিবেশ বিরাজ করে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, যারা মহৎ হৃদয় সম্পন্ন একমাত্র তারাই নারীদের সম্মান প্রদর্শন করে। তিনি আরো বলেছেন,  যে পরিবার অর্থাৎ স্ত্রীকে অসম্মান করে, সে নিজের জীবনের সুখ নষ্ট করে ফেলে। রাসূল (সাঃ)-এর এই মহান বাণীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তাঁর সকল উম্মতের উচিত নিজ নিজ স্ত্রীকে সম্মান করা। ইমাম সাদিক (আঃ)ও তাঁর পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, যে বিয়ে করেছে তার অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হলো স্ত্রীকে সম্মান করা। পারিবারিক সুখ-শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থেই তারা স্ত্রীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। কিন্তু এই সম্মান দেখানোর বিষয়টি অন্তর থেকে উত্থিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। সম্মান ভালোবাসারই প্রকাশ। ফলে ভালোবাসা যেমন অকৃত্রিম হওয়া দরকার, সম্মান প্রদর্শনও ঠিক তাই হওয়া উচিত। দৈনন্দিন জীবনে মানুষ বিচিত্র ঘটনাবলীর সম্মুখীন হয়। এসব ঘটনা সবসময় সুখকর নাও হতে পারে। অফিসে বিচিত্র মানসিকতার সহকর্মী থাকে। সবাই যে বন্ধু সুলভ হবে তা নাও হতে পারে। ফলে আপনি যদি কারো কাছ থেকে কখনো অবন্ধুসুলভ আচরণ পান, তাহলে আপনার মনটা খারাপ হয়ে থাকতে পারে। তার উপর হয়তো বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেলেন, কিংবা দুর্ভাগ্যবশত: কোন ছিনতাইকারী আপনার সর্বস্ব লুট করে নিল-এরকম অবস্থায় আপনি বিক্ষুদ্ধ মনে বাসায় ফিরলেন। বাসায় ফেরার পর আপনি আর কাউকে না পেয়ে বেচারী স্ত্রীর ওপর মনের ঝাল ঝাড়লেন। আপনার ছেলে মেয়েরা আপনার আচরণ দেখে ভাবলো, বাবা তো নয় যেন এক আজরাইল বাসায় ফিরেছে। তারা আপনার কাছে না ঘেঁষে ভয়ে পালিয়ে বাঁচলো। এদিকে আপনার স্ত্রী আপনার জন্যে সারাদিন খেটে যে রান্নাবান্না করলো, সেই রান্নাবান্নার ছোট-খাটো স্বাভাবিক ত্রুটিতে আপনি অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করলেন, কিংবা ঘরদোর হয়তো বাচ্চারা অগোছালো করে রেখেছে, কিংবা তারা চেঁচামেচি করছে-যাই হোক না কেন আপনি যদি এসব অজুহাতে আপনার স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার করেন, তাহলে এরচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী থাকতে পারে আপনি নিজেই আপনার সংসারকে দোজখে পরিণত করলেন। আপনার এই আচরণ মোটেই অভিভাবক সুলভ নয়, বরং একজন অত্যাচারী স্বৈরাচারের মতো। আপনার মতো স্বৈরাচারের শোষণে আপনার পুরো পরিবার অসহ্য যন্ত্রণার শিকার হচ্ছে। আর আপনার স্ত্রী যে তার স্বামীকে দেখামাত্রই খুশী হয়ে ওঠার কথা ছিল, সে আপনার চেহারা দেখা মাত্রই বিরক্ত হয়ে উঠবে। আপনার সঙ্গই তার কাছে বিষময় মনে হবে। ধীরে ধীরে আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইবে। বাচ্চাদের কারণে তা অসম্ভব হলে ঘৃণা করতে শুরু করবে। এর ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি আপনার হবে, তাহলো আপনার এই আচরণের প্রভাব ছেলেমেয়েদের মনে ব্যাপকভাবে পড়বে। ছেলেমেয়েরা ধীরে ধীরে মানসিকভাবে এতটাই জটিল বা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে পারে যে, তারা আপনার চেয়েও ভয়ঙ্কর কাজ শুরু করতে পারে। অপরাধ জগতে যারা প্রবেশ করে, তাদের পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধান করে দেখলে এই জটিল মানসিকতার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে। যার মূল কারণ আপনারই রূঢ় ও ভারসাম্যহীন আচরণ। আপনার সাময়িক অসহিষ্ণুতা কতো মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা একবার ভেবে দেখুন।
সর্বোপরি একটা বিষয় আপনার সুষ্ঠুভাবে চিন্তা করা উচিত, তাহলো যেই দুর্ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার কারণে আপনি রূঢ় আচরণ শুরু করলেন, সেই ঘটনার জন্য আপনি, আপনার স্ত্রী কিংবা ছেলেমেয়েরা কী দায়ী? মোটেই না। ফলে আপনার নিরপরাধ পরিবারের সদস্যদের সাথে নির্দয় আচরণ করা কি অন্যায় নয়? বুদ্ধিমানের কাজ হলো সবকিছুকে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা করা। ধৈর্যহারা না হয়ে নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কাজকর্ম সেরে ধীরে সুস্থে দুর্ঘটনার কথাটি আপনার স্ত্রীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সামনে তুলে ধরলে তারা বরং কষ্টটিকে আপনার সাথে ভাগ করে নেবে। এতে সবাই কষ্টের অংশীদার হলো। অন্যদিকে আপনাকে কতোভাবে যে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করবে, তাতে আপনার কষ্টকে আর কষ্টই মনে হবে না। আর আপনার সন্তানরা আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে। প্রতিদিন তারা অপেক্ষায় থাকবে কখন আপনি বাসায় ফিরবেন। ঠিকমতো আপনি পৌঁছলেন কিনা এ ব্যাপারে তারা সদা উদ্বিগ্ন থাকবে। যার ফলে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হবে। তাই কোন সমস্যার মোকাবেলায় উগ্রতা পরিহার করে ঠাণ্ডা মাথায় সামাধান করার চেষ্টা করুন। পরিবারের সবার সাথে বিশেষ করে স্ত্রীর সাথে হাসিখুশী থাকার চেষ্টা করুন। সুন্দর আচরণ করার চেষ্টা করুন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এটাকে ঈমানের নিদর্শন বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি সুন্দর আচরণ করে, তার ঈমান অধিকতর পূর্ণ। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ যে তার নিজ পরিবারের সাথে সুন্দর আচরণ করে। রাসূল (সা.) আরো বলেছেন, সুন্দর আচরণের চেয়ে শ্রেয়তর কোন কর্ম নেই। (তিরমিযী)

কুরআনের আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব

কুরআনের আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব
কুরআনের আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব

মাতৃভাষার সাথে মানুষের জন্মগত ও স্বভাবগত চাহিদা রয়েছে। আর এ চাহিদার অমূল্যায়ন ইসলাম কস্মিনকালেও করেনি। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা এবং রাষ্ট্রীয় ভাষাও বাংলা। সুতরাং বাংলা ভাষাকে অমূল্যায়ন করা বা অবহেলা করা কখনো সমীচীন হবে না।
ইসলাম মাতৃভাষাকে মর্যাদার উচ্চাসনে সমাসীন করেছে। তাইতো দেখা যায় যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যুগেযুগে পথভ্রষ্ট মানব জাতিকে সুপথে পরিচালনা করার নিমিত্ত অসংখ্য নবী -রাসূলকে আসমানী কিবাতসহ তাঁদের স্ব-জাতির ভাষায় প্রেরণ করেছেন।
যেমন হযরত দাউদ (আ.) এর ‘যবূর’ ছিল, তাঁর সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা ‘ইউনানীতে’। হযরত মূসা (আ.) এর ‘তাওরাত’ ছিল, তাঁর সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা ‘ইবরানীতে’। হযরত ঈসা (আ.) এর ইনজীল ছিল, তাঁর স্ব-জাতির মাতৃভাষা সুরইয়ানীতে’ এবং আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর প্রতি অবতীর্ণ ‘কুরআন’ ছিল তাঁর স্ব-জাতির মাতৃভাষা ‘আরবীতে’। এভাবেই আল্লাহর বিধি-বিধান মানব জাতির কাছে পৌঁছানোর সহজতম পথটি অনুসৃত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ   ‘আমি সব রাসূলকেই তাঁদের স্ব-জাতির ভাষাভাষি করে প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে (আমার বাণী ) সু স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারেন।’ (সূরা ইবরাহীম:৪)
এখানে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) যেহেতু সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছিলেন, সেহেতু বিশ্বের প্রতিটি জাতির নিকট আল্লাহর বিধি-বিধান সঠিকরূপে পৌঁছানোর জন্য প্রত্যেক জাতির ভাষায় পৃথক পৃথক কুরআন অবতীর্ণ করা হলো না কেন? তার প্রতি উত্তরে উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন ধরনের অভিমত পেশ করেছেন। তন্মধ্যে বাংলা পাক ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত তাফসীর বিশারদ মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রহ.) এর অভিমত পরিধাণযোগ্য। তিনি বলেন:
“বিশ্বের জাতিসমূহের মধ্যে শতশত ভাষা প্রচলিত রয়েছে। এমতাবস্থায় সবাইকে হেদায়াত করার দু‘টি উপায় সম্ভবপর ছিল। প্রথমতঃ প্রত্যেক জাতির ভাষায় পৃথক-পৃথক কুরআন অবতীর্ণ হওয়া এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর শিক্ষাও তদ্রƒপ প্রত্যেক জাতির ভাষায় ভিন্ন-ভিন্ন হওয়া। আল্লাহর শক্তির সামনে এরূপ ব্যবস্থাপনা মোটেই কঠিন ছিলনা; কিন্তু সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য এক রাসূল এক গ্রন্থ এবং এক শরীয়ত প্রেরণ করার মাধ্যমে তাদের মধ্যে হাজারো মতবিরোধ সত্ত্বেও ধর্মীয় চারিত্রিক ও সামাজিক ঐক্য  ও সংহতি স্থাপনের যে মহান লক্ষ্য অর্জন করার উদ্দেশ্য ছিল, এমতাবস্থায় তা অর্জিত হত না। এছাড়া প্রত্যেক জাতির ও প্রত্যেক দেশের কুরআন ও হাদীস ভিন্ন-ভিন্ন ভাষায় থাকলে কুরআন পরিবর্তনের অসংখ্য পথ খুলে যেত এবং কুরআন একটি সংরক্ষিত কালাম, যা বিজাতি এবং কুরআন অবিশ্বাসীরাও মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করে। এ অলৌকিক বৈশিষ্ট্য খতম হয়ে যেত।
এছাড়া একই ধর্ম এবং একই গ্রন্থ সত্ত্বেও এর অনুসারীরা শতধাবিভক্ত হয়ে যেত এবং তাদের মধ্যে ঐক্যের কোন কেন্দ্রবিন্দুই অবশিষ্ট থাকতো না। এক আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল হওয়া সত্ত্বেও এর ব্যাখ্যা তাফসীরের বৈধ সীমার মধ্যে মত-পার্থক্য দেখা দিয়েছে। অবৈধ পন্থায় যেসব মত বিরোধ হয়েছে, সেগুলোর তো ইয়ত্তা নেই।
এ থেকেই উপরিউক্ত বক্তব্যের সত্যতা সম্যক অনুমান করা যায়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যারা কোন না কোন স্তরে কুরআনের বিধি-বিধান পালন করে, তাদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য বিদ্যমান রয়েছে।
মোট কথা রাসূল (সা.) এর নবুওয়াত সমগ্র বিশ্বের জন্য ব্যাপক হওয়ার প্রেক্ষিতে প্রত্যেক জাতির ভাষায় ভিন্ন-ভিন্ন কুরআনের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ববাসীর শিক্ষা ও হেদায়াতের পন্থাকে কোন স্থূলবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিও সঠিক ও নির্ভুল মনে করতে পারে না। তাই দ্বিতীয় পন্থাটিই অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অর্থাৎ রাসূলের ভাষাই কুরআনের ভাষা হবে।
নায়েবে রাসূল আলেমগণ প্রত্যেক জাতি ও প্রত্যেক দেশে রাসূল (সা.) এর নির্দেশাবলী তাদের ভাষায় বোঝাবেন এবং প্রচার করবেন। আল্লাহ তা‘আলা এর জন্যে বিশ্বের ভাষাসমূহের মধ্য থেকে আরবী ভাষাকে নির্বাচন করেছেন। (মা‘আরেফুল কুরআন, প্রকাশনায় মদীনা মুনাওয়ারা ৭১২ পৃষ্ঠা)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মাতৃভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) কে উদ্দেশ্য করে বলেন: আমি কুরআনকে আপনার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে আপনি এর  আল্লাহভীরুদেরকে সুসংবাদ দেন এবং কলহ প্রিয় সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন। (সূরা মারইয়াম: ৯৭)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন: আমি আপনার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তারা স্মরণ করে। (সূরা দুখান: ৫)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন: আমি এ কুরআনকে আরবী ভাষায় (অবতীর্ণ) করেছি, যাতে তোমরা বুঝ। (সূরা যুখরুফ:৩)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন: এ কুরআন বিশ্বজাহানের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত ফেরেশতা একে নিয়ে অবতরণ করেছে আপনার অন্তরে, যাতে আপনি ভীতি প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হন সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। (সূরা শু‘আরা: ১৯২-১৯৫)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন: আমি এ কুরআনকে কোন ভিন্ন ভাষা-ভাষীর প্রতি অবতীর্ণ করতাম অতঃপর তিনি তা তাদের কাছে পাঠ করতেন, তাহলে তাদের তারা বিশ্বাস স্থাপন করতো না। (সূরা শু‘আরা: ১৯৮-১৯৯)
আর জাতিকে সুপথে পরিচালনা করতে হলে পরিচালক মণ্ডলীকে জাতির বোধগম্য ভাষায় কুরআন ও হাদীসের পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী অবশ্যই হতে হবে, নচেৎ জাতির সামনে মনের ভাব ও মূল বক্তব্য ব্যক্ত করা কখনো সম্ভব হবে না। যদি নবীদের ভাষা উম্মতের ভাষা থেকে ভিন্ন হত, তাহলে নবীদেরকে উম্মতের নিকট আল্লাহর বিধ-বিধান পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অনুবাদের ঝুঁকি গ্রহণ করতে হতো। এরপরও উম্মতের কাছে আল্লাহর বিধি-বিধান সঠিকরূপে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে থেকে যেত অসংখ্য সন্দেহ। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ দেশে কোন নবী প্রেরণ করতেন, তাহলে তাঁকেও এদেশের মাতৃভাষার মাধ্যমেই প্রেরণ করতেন।
দ্বিতীয়তঃ বিশ্বের বুকে যতগুলো শিশু জন্মগ্রহণ করে, তারা বুঝ, জ্ঞান ও অনুভূতির ভাষা শিক্ষা করে, মাতা-পিতা, ভাই-বোন এবং পাড়া প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এ ভাষা শিশুদের মনের দুয়ার খুলে দেয় এবং বুঝতে, শিখতে ও জানতে সাহায্য করে।
এমনিভাবে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বাতেল যে যুগে যে-রূপ নিয়ে মানব সমাজে এসেছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, যে যুগের নবীকেও তার মুকাবেলা করার জন্য সে ধরণের মু‘জিযা দিয়ে পাঠিয়েছেন।
হযরত নূহ (আ.)-এর যুগ ছিল জাহাজ শিল্পের উন্নতির যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে জাহাজ শিল্পের জ্ঞান দান করে ছিলেন।
হযরত দাউদ (আ.)-এর যুগ ছিল গান-বাজনা চর্চার যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এমন সুমধুর কণ্ঠ দান করে ছিলেন যে, তাঁর কণ্ঠে আল্লাহর কালাম শ্রবণের জন্য মানুষ ছাড়াও, আকাশের উড়ন্ত পাখি পর্যন্ত নেমে আসতো।
হযরত সুলাইমান (আ.)Ñএর যুগ ছিল রাজ ক্ষমতা এবং অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্যের যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে মানব ইতিহাসের সর্বাধিক রাজক্ষমতা এবং অর্থ-সম্পদ দান করেছিলেন। তিনি এমন রাজ-ক্ষমতা সম্পন্ন ছিলেন যে, কেবলমাত্র জিন-পরী এবং পশু-পাখি কেন? বায়ূ পর্যন্ত তাঁর আজ্ঞাধীন থাকতে বাধ্য ছিল।
হযরত মূছা (আ.)-এর যুগ ছিল যাদু বিদ্যার উৎকর্ষের যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে ‘লাঠি’ দিয়ে সাপ বানানোর ক্ষমতা দান করেছিলেন।
হযরত ঈসা (আ.)-এর যুগ চিকিৎসা বিদ্যার সোনালীর যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এমন রোগ নিরাময় ক্ষমতা দান করেছিলেন যে, তার হাতের স্পর্শের জন্মান্ধ ব্যক্তি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেত এবং কুষ্ঠরোগী রোগ থেকে মুক্তি পেত। এমনকি মৃত ব্যক্তিও আল্লাহর হুকুমে জীবিত হয়ে যেত।
এমনিভাবে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর যুগ ছিল সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ্যেত্বের যুগ। তাই তাঁকে দেওয়া হয়েছিল গোটা বিশ্বের অদ্বিতীয় উজ্জ্বলতম সাহিত্যগ্রন্থ আল-কুরআন। যাকে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর সর্বাপেক্ষা বড় এবং স্থায়ী মু‘জিযা বলে উল্লেখ করে, গোটা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। যেমন কুরআনুল কারীমে সমগ্র মানব গোষ্ঠীকে সম্বোধন করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন যে, যদি তোমরা কুরআনকে আল্লাহর কালাম বলে স্বীকার না কর; বরং মানব রচিত  মনে কর, তাহলে তোমরাও তো মানুষ; এর মত একটি গ্রন্থ রচনা করে নিয়ে এসো। প্রয়োজনে তোমাদের সাথে জিনদেরকেও মিলিয়ে নাও।
যখন তারা কুরআনের ন্যায় গ্রন্থ রচনা করতে অপারগ হলো, তখন তাদের অপারগতাকে আরো প্রকটভাবে প্রমাণ করার জন্য পর্যায়ক্রমে বলা হয়েছে, যে তোমরা কুরআনের সূরার ন্যায় দশটি সূরা তৈরী কর। সর্বশেষে বলা হয়েছে যে, তোমরা কুরআনের সূরার ন্যায় একটি সূরা তৈরী কর। নি¤েœ এ সম্পর্কে আয়াতসমূহ উল্লেখ করা হলো।
“বল, যদি মানুষ ও জিন এ কুরআনের অনুরূপ হাজির করার জন্য একত্র হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ হাজির করতে পারবে না। যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়।” (সূরা আল-ইসরা : ৮৮)
নাকি তারা বলে, ‘সে এটা রটনা করেছে’? বল, ‘তাহলে তোমরা এর অনুরূপ দশটি সূরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে আন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’। (সূরা হূদ: ১৩)
নাকি তারা বলে, ‘সে তা বানিয়েছে’? বল, ‘তবে তোমরা তার মত একটি সূরা (বানিয়ে) নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’।  (সূরা ইউনুস: ৩৮)
আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার মত একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (সূরা বাকারা: ২৩)
অনুরূপভাবে তাদের অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য আমাদের প্রিয়নবী (সা.) একটি অভিনব পন্থা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কুরআনের সবচেয়ে ছোট সূরা ‘সূরায়ে কাউছারের’ একটি আয়াত إنا أعطيناك الكوثر লিখে কাবা ঘরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখার জন্য সাহাবায়ে কেরামকে পরামর্শ দিলেন এবং তৎকালীন প্রথিত যশা কবি-সাহিত্যিক এবং জ্ঞানী-গুনীদেরকে ঐ আয়াতের বর্ণনা ভঙ্গি, ভাষাশৈলী, অনন্য রচননীতি এবং সমিল ছন্দের ন্যায় আরেকটি আয়াত রচনা করার জন্য আহ্বান জানালেন। আরবের সেরা কবি সাহিত্যিকগণ তাঁর এ ডাকে সাড়া দিয়ে শত চেষ্টা করেও ঐ আয়াতের ন্যায় একটি আয়াত রচনা করতে সমর্থ হয়নি, ফলে তারা জোটবদ্ধভাবে পরাজয় বরণের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
অবশেষে তখনকার যুগের শ্রেষ্ঠ কবি ‘লবিদ ইবনে রাবিয়াহ’ উক্ত আয়াতটি লিখে দিলেন: ليس هذا كلام البشر অর্থাৎ এটা কোন মানব রচিত গ্রন্থ নয়। সাথে সাথে ঐ ছন্দের মাধ্যমেই তাদের পরাজয় বরণের ঘোষণাটি আরো প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে।
মোটকথা, কুরআনের অসাধারণ বর্ণনা ভঙ্গি, ভাষাশৈলী, অনন্য রচনানীতি এবং বিষয়বস্তুর মৌলিকত্ব ও গভীরতার কারণেই কুরআন ও কুরআনের বাহক নবী (সা.) এর বিরুদ্ধে জান-মাল এবং ইজ্জত-আবরু সবকিছু ব্যয় করার জন্য তারা প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও কুরআনের এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে একটি আয়াত রচনা করতে কেউ সাহসী হয় নি।
কুরআনের এ দাবী বা চ্যালেঞ্জে সারা আরববাসী  শুধু পরাজয়বরণ করেই ক্ষান্ত হয়েছে, তা নয়; বরং একে অনন্য বা অদ্বিতীয় বলেও প্রকাশ্যভাবে স্বীকার করেছে। যেমন কথিত আছে, আরবের একজন সরদার ‘আসআদ ইবনে যেরার’ রাসূল (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা.) এর নিকট স্বীকার করেছেন যে, তোমরা অনর্থক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধাচরণ করে নিজেদের ক্ষতি করছো এবং পারস্পরিক সম্পর্কচ্ছেদ করছো। আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে, নিশ্চয় তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি যে কালাম পেশ করেছেন তা আল্লাহর, এতে বিন্দু মাত্রও সন্দেহ নেই। (মা‘আরেফুল কুরআন বাদশা ফাহাদ কর্তৃক প্রকাশিত ২৪ পৃষ্ঠা)
আরবের জাহেলী যুগের সাতজন শ্রেষ্ঠ কবির অন্যতম সাহাবী লবীদ (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর নি¤œলিখিত দু‘টি ছন্দ ব্যতীত অন্য কোন কবিতা আবৃত্তি করেননি। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দেন যে, ‘কুরআনের (অনন্য ভাষাশৈলীর) সামনে কবিতা আবৃত্তি করতে আমি লজ্জাবোধ করি।’ কবি লাবীদের ছন্দ দু‘টি নিম্নে দেওয়া হলো:
< ألا كل شيئ ماخلا الله باطل
< و كل نعيم لا محالة زائل
< نعيمك في الدنيا غرور و حسرة
< و عيشك في الدنيا محال  و باطل
“জেনে রেখ! আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সবই অকার্যকর। সমস্ত নিয়ামত অবশ্যই ধ্বংস হবে। তোমার পার্থিব নেয়ামত ধোঁকা এবং আফসোসের সামগ্রী। আর তোমার সুখের জীবন এ পৃথিবীতে নিশ্চয় অসম্ভব ও অকার্যকর।
হযরত মূছা (আ.) যখন আল্লাহর দিদার লাভের উদ্দেশ্যে ‘তূর পাহাড়ে’ গিয়েছিলেন, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর সাথে তাঁর ভাষাতেই কথোপকথোন করেছিলেন। এমনিভাবে আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ (সা.) যখন ‘হেরা গুহায়’ আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) তাঁর ভাষাতেই তাঁর নিকট আল্লাহর বাণী নিয়ে এসেছিলেন।
দ্বিতীয়তঃ ইসলাম মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিয়েছে বলেই ইসলাম যেখানেই পৌঁছেছে, সেখানকার মাতৃভাষা পরিচর্যায় প্রেরণা যুগিয়েছে। এ সত্যটিকে মর্মেমর্মে উপলদ্ধি করে আমাদেরকেও স্ব-স্ব মাতৃভাষায় দক্ষতা ও পারদর্শিতা অর্জন করে ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রচার ও প্রসারের কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
আমাদের মাতৃভাষা ‘বাংলা’। বাংলাদেশসহ পশ্চিম বঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে প্রায় ত্রিশ কোটি বাংলা ভাষা-ভাষী। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর নিকট নবীদের অনুসারী হিসেবে যুগ চাহিদার ভিত্তিতে আল্লাহর বিধি-বিধান এবং ইসলামের সুমহান আদর্শের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে উলামায়ে কেরামগণসহ বক্তাগণের মাতৃভাষায় দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজনীয় নয় কি?

তাওহীদের সংজ্ঞা ও শ্রেণী বিভাগ

তাওহীদের প্রকারভেদ

তাওহীদের আক্ষরিক অর্থ একীকরণ ( কোন কিছু এক করা) অথবা দৃঢ়ভাবে এককত্ব ঘোষণা করা এবং এটার উৎপত্তি আরবী ‘ওয়াহহাদা’ শব্দ হতে যার অর্থ এক করা, ঐক্যবদ্ধ করা অথবা সংহত হওয়া। কিন্তু যখন তৌহিদ শব্দটি আল্লাহর (অর্থাৎ তৌহিদুল্লাহ) সম্বন্ধে ব্যবহৃত হয় তখন আল্লাহ সম্পর্কিত মানুষের সকল পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ কর্মকান্ডে আল্লাহর এককত্ব উপলদ্ধি করা ও তা নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্ষুন্ন রাখা বুঝায়। আল্লাহ এক, তাঁর আধিপত্যে এবং তাঁর কর্মকান্ডে (রবুবিয়াহ) কোন শরীক বা অংশীদার নেই। এটাই বিশ্বাস যে, আল্লাহ একক, তাঁর রাজত্বে এবং কর্মে কোন শরীক নেই (রবুবিয়াহ)।

 তিনি তাঁর মৌলিকত্বে এবং গুণাবলীতে অতুলনীয় (আসমা ওয়াস সিফাত) এবং উপাস্যরূপে চির অপ্রতিদ্বন্দ্বী (উলুহিয়াহ/ইবাদাহ)।

এই তিনটি বিষয়কে ভিত্তি করে তাওহীদের শ্রেণী বিন্যাস করা হয়েছে। এই শ্রেণী তিনটি পরস্পর ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং একটির সঙ্গে অপরটি এতই অবিচ্ছেদ্য যে, কেউ যদি একটি বিষয় বাদ দেন তাহলে তিনি তাওহীদের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হবেন। উপরে বর্ণিত তাওহীদের যে কোন একটি বিষয় বাদ দেয়াকে “শির্ক” (অংশীদারী) বলে; আল্লাহকে অংশীদারদের সঙ্গে সংযুক্ত করা, যা ইসলাম অর্থে প্রকৃতপক্ষে পৌত্তলিকতা।

তাওহীদের তিন শ্রেণীকে সাধারণতঃ নিম্নলিখিত শিরোনামে উল্লেখ করা হয়ে থাকেঃ
১) তাওহীদ আর-রবুবিয়াহ (প্রতিপালকের এককত্ব অক্ষুন্ন রাখা)
২) তাওহীদ আল-আছমা ওয়াছ ছিফাত (আল্লাহর নাম ও গুনাবলীর এককত্ব বজায় রাখা)
৩) তাওহীদ আল-ইবাদাহ (আল্লাহর ইবাদতের এককত্ব বজায় রাখা)

রাসুল (সঃ) এর সময় তাওহীদের মূল তত্ত্বগুলি এমনভাবে বিশ্লেষণের প্রয়োজন ছিল না বিধায় রাসূল (সাঃ) অথবা তাঁর সাহাবাগণ কর্তৃক তাওহীদকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়নি। তা সত্ত্বেও,কুরআনের আয়াত এবং রাসূল (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণের ব্যাখ্যামূলক বক্তব্যের মাধ্যমে তাওহীদের শ্রেণীগুলি ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে।

তাওহীদ আর-রবুবিয়াহ

তাওহীদ আর-রবুবিয়ার মূল কথা হচ্ছে যে যখন কিছুই ছিল না তখন আল্লাহ একাই সকল সৃষ্টিকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব দেন; সৃষ্টি থেকে অথবা সৃষ্টির জন্য কোন প্রয়োজন মেটানোর কারণ ব্যতিরেকেই আল্লাহ সৃষ্ট জগৎ প্রতিপালন করেন। তিনি সমগ্র বিশ্ব ও এর অধিবাসীদের একমাত্র প্রভু এবং তাঁর সার্বভৌমত্বের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আরবী ভাষায় “রবুবিয়াহ” শব্দটির মূল ধাতু হচ্ছে “রব” (প্রতিপালক) যা একই সাথে সৃষ্টি ক্ষমতা এবং প্রতিপালন উভয় গুণের পরিচয় বহন করে। এই শ্রেণী বিন্যাস অনুযায়ী আল্লাহই একমাত্র সত্যিকার শক্তি, তিনিই সকল বস্তুর চলাফেরা ও পরিবর্তনের ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনি যেটুকু ঘটনা ঘটাতে দেন সেটুকু ব্যতীত সৃষ্টি জগতে কিছুই ঘটে না। এই বাস্তবতার স্বীকৃতি স্বরূপ রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) প্রায়ই “লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ”(আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কোন বিচলন অথবা ক্ষমতা নেই) বলে বিস্ময়সূচক উক্তি করতেন।

কুরআনের বহু আয়াতে রবুবিয়াহ আকীদার ভিত্তি পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ বলেছেন-

 ১) “আল্লাহ সমস্ত কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর নিয়ন্তা।” (সূরা আয-যুমার ৩৯: ৬২)

২) অথচ আল্লাহই তোমাদেরকে এবং তোমরা যা কর তা সৃষ্টি করেছেন? (সুরা আছ্-ছাফফাত ৩৭: ৯৬)

৩)  আর তুমি নিক্ষেপ করনি যখন তুমি নিক্ষেপ করেছিলে; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন (সূরা আল্-আনফা’ল ৮: ১৭)

৪)   “আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কোন বিপদই আপতিত হয় না।” (সূরা আত্-তাগাবুন ৬৪: ১১)

রাসূল (সঃ) এই ধারণার আরও বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন,

واعلم أن الأمةلو اجتمعت على أن ينفعوك بشيء لم ينفعوك إلابشيء قد كتبه الله لك,وإن اجتمعواعلى أن يضروك بشيء لم يضروك إلا بشيء قد كتبه الله عليك , رفعت الأقلام وجفت الصحف رواه الترمذي وقال : حديث حسن صحيح

সাবধান, যদি সমস্ত মানব জাতি তোমাকে সাহায্য করার জন্য কিছু করতে চায়, তারা শুধু অতটুকুই করতে সক্ষম হবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য আগেই লিখে রেখেছেন। অনুরূপ, যদি সমস্ত মানব জাতি ক্ষতি করার জন্য একত্রিত হয়, তারা শুধু ততটুকুই ক্ষতি করতে সক্ষম হবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য আগেই লিখে রেখেছেন। কাজেই, মানুষ যা সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য বলে ধারণা করে তা শুধুমাত্র এই জীবনের পুর্ব নির্ধারিত পরীক্ষার অংশ। আল্লাহ যে ভাবে নির্ধারণ করে রেখেছেন সেই ভাবেই ঘটনাসমূহ সংঘটিত হয়।

তাওহীদুর রবুবিয়্যার প্রতি ঈমানের দাবী হচ্ছে নিম্নে লিখিত ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ব মেনে নেয়াঃ

 ১) “আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা”- সূরা আন‘আম ৬:১০২/ আরাফ ৭:৫৪/ যুমার ৩৯:৬৫/ সাফফাত ৩৭:৯৬।

২) “তিনিই আসমান, যমীন এবং এর মধ্যবতী সবকিছুর প্রতিপালক”- সূরা ফাতিহা ১:১/ শুয়ারা ২৬:২৪/ নাস ৪:১।
৩) “তিনিই সবপ্রানীর একমাত্র জীবিকা দাতা”- সূরা হুদ ১১:৬/ যারিয়াত ৫১:৫৮।
৪) “সমস্ত কিছুর একচ্ছত্র মালিকানা তাঁরই”- সূরা বাকারা ২:২৫৫/ মু’মিনুন ২৩:৮৪-৮৫।
৫) “আল্লাহই আসমান-যমীন সহ সব কিছুর পরিচালনাকারী”- সূরা সাজদা ৩২:৫।
৬) “আল্লাহই আসমান, যমীন এবং এর মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুর একচ্ছত্র কতৃর্ ত্বের অধিকারী”- সূরা মু’মিনুন ২৩:৮৮।
৭) “আল্লাহই একমাত্র সার্বভৌমত্বের অধিকারী”- সূরা আলে ইমরান ৩:২৬/ ফোরকান ২৫:২/ আরাফ ৭:১৫৮।
৮) “আল্লাহই একমাত্র আইন-বিধান দাতা, হালাল-হারাম ঘোষনাকারী”- সূরা ইউসুফ ১২:৪০/ আরাফ ৭:৫৪/ রাদ
১৩:৪১/ কাসাস ২৮:৭০, ৮৮/ আন’আম ৬:৫৭/ ১০:৫৯/ ৯:৩৭/ ৫:৫০/ নাহল ১৬:১১৬।
৯) “তিনিই ভাল-মন্দ নির্ধারণকারী, সাহায্যকারী, বিপদাপদ দাতা এবং মুক্তিদাতা, রক্ষাকর্তা”- সূরা তাগাবুন ৬৪:১১/
ইউনুস ১০:১০৭/ আন’আম ৬:৬৪/ আলে ইমরান ৩:২৬/ ৭:১৮৮/ ৩:১৫০/ ৩৬:৭৪-৭৫।
১০) “তিনিই একমাত্র সন্তানদাতা এবং জীবন-মৃত্যুর মালিক”- সূরা শুরা ৪২:৪৯-৫০/ হাজ্জ ২২:৬৬।
১১) “তিনিই একমাত্র গায়েব বা অদৃশ্যের জ্ঞানী”- সূরা আন’আম ৬:৫৯/ নামল ২৭:৬৫/ লুকমান ৩১:৩৪।

তাওহীদ আল্-আছ্মা ওয়াছ-ছিফাত (আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর এককত্ব বজায় রাখা)-এই শ্রেণীর তাওহীদের চারটি প্রধান রূপ আছেঃ

১) আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর এককত্ব বজায় রাখার প্রথম শর্ত হ’ল, কুরআন এবং হাদীসে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) আল্লাহর যেভাবে বর্ণনা দিয়েছেন সেভাবে ছাড়া আর কোনভাবে আল্লাহর নাম এবং গুণাবলীর বর্ণনা দেয়া যাবে না। তিনি বলেন,

আর যেন তিনি শাস্তি দিতে পারেন মুনাফিক নারী-পুরুষ ও মুশরিক নারী-পুরুষকে যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে; তাদের উপরই অনিষ্টতা আপতিত হয়। আর আল্লাহ তাদের উপর রাগ করেছেন এবং তাদেরকে লা‘নত করেছেন, আর তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জাহান্নাম; এবং গন্তব্য হিসেবে তা কতইনা নিকৃষ্ট! (সূরা আল্-ফাত্হ্ ৪৮: ৬)

কাজেই ক্রোধ আল্লাহর গুণাবলীর একটি। এটা বলা ভূল হবে যে, যেহেতু ক্রোধ মানুষের মধ্যে একটি দুর্বলতার চিহ্ন যা আল্লাহর জন্য শোভন নয় সেহেতু আল্লাহর ক্রোধ অবশ্যই তাঁর শাস্তি বুঝায়। কোন কিছুই তাঁহার সদৃশ নহে (সূরা আশ্-শূরা ৪২: ১১)

২) তাওহীদ আল্-আছ্মা ওয়াস-সিফাত এর দ্বিতীয় রূপ হ’ল আল্লাহর উপর কোন নতুন নাম ও গুণাবলী আরোপ না করে তিনি নিজেকে যেভাবে উল্লেখ করেছেন সেভাবেই তাঁকে উল্লেখ করা। উদাহরণস্বরূপ, যদিও তিনি বলেছেন যে তিনি রাগ করেন তথাপি তাঁর নাম আল্-গাদিব (রাগী জন) দেয়া যাবে না কারণ আল্লাহ বা তাঁর রাসুল (সাঃ) কেউ এই নাম ব্যবহার করেননি। এটা একটি ক্ষুদ্র বিষয় মনে হতে পারে,কিন্তু আল্লাহর অসত্য বা ভূল বর্ণনা রোধ করার জন্য তৌহিদ আল্-আছ্মা ওয়াছ-ছিফাত অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ সসীম মানুষের পক্ষে কখনোই অসীম স্রষ্টার সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়।

৩) তাওহীদ আল্-আছ্মা ওয়াছ-ছিফাত এর তৃতীয় শর্ত অনুযায়ী আল্লাহকে কখনোই তাঁর সৃষ্টির গুণাবলি দেয়া যাবে না। উদাহরণস্বরূপ, বাইবেল ও তৌরাতে দাবী করা হয় যে আল্লাহ ছয় দিনে বিশ্ব সৃষ্টি করেন এবং তারপর সপ্তম দিনে নিদ্রা যান। এই কারণে ইহুদি ও খৃষ্টানগণ হয় শনিবার নতুবা রবিবারকে বিশ্রামের দিন হিসাবে নেয় এবং ঐ দিন কাজ করাকে পাপ বলে গণ্য করে। এই ধরণের দাবী স্রষ্টার উপর তাঁর সৃষ্টির গুণাবলী আরোপ করে। মানুষই গুরুভার কাজের পর ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং সবলতা পুনরুদ্ধারের জন্য তাদের ঘুমের প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে আল্লাহ কুরআনে পরিস্কারভাবে উল্লেখ করেছেন,
‘‘তাঁহাকে তন্দ্রা অথবা নিদ্রা স্পর্শ করে না।’’ (সূরা আল বাকারা ২: ২৫৫)

 বাইবেল ও তৌরাতের অন্য জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে যে মানুষ যেমন তার ভূল উপলদ্ধি করে অনুতপ্ত হয় তেমনি স্রষ্টাও তাঁর খারাপ চিন্তার জন্য অনুতপ্ত হন।অনুরূপভাবে স্রষ্টা একটি আত্মা অথবা তাঁর একটি আত্মা আছে বলে দাবী করা তৌহিদ আল্-আছমা ওয়াছ ছিফাতকে সম্পুর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়। আল্লাহ কোরআনের কোন জায়গায় নিজেকে আত্মা বলে উল্লেখ করেননি অথবা তাঁর রাসুল (সঃ) হাদিসে ঐ ধরণের কোন বক্তব্য প্রদান করেননি। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ আত্মাকে তাঁর সৃষ্টির একটি অংশ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।আল্লাহর গুণাবলী উল্লেখ করতে কোরআনের আয়াতকে মৌলিক নিয়ম হিসাবে অনুসরণ করতে হবে,
কোন কিছুই তাঁহার সদৃশ নহেতিনি সর্বশ্রোতাসর্বদ্রষ্টা। (সূরা আশ-শূরা ৪২ : ১১)

শ্রবণ ও দর্শন মানুষের গুণাবলী কিস্তু যখন স্রষ্টার উপর আরোপিত করা হয় তখন সেগুলি তুলনাবিহীন এবং ত্রুটিমুক্ত। যাহোক এই গুণাবলী মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চোখ ও কান অপরিহার্য, যা স্রষ্টার জন্য প্রযোজ্য নয়। স্রষ্টা সম্বন্ধে মানুষ কেবলমাত্র ততটুকুই জ্ঞাত যতটুকু তিনি তাঁর পয়গম্বরদের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। সুতরাং, মানুষ এই সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে অবস্থান করতে বাধ্য। মানুষ যদি স্রষ্টার বর্ণনা দিতে লাগামহীন বুদ্ধি প্রয়োগ করে তাহলে আল্লাহকে তাঁর সৃষ্টির গুণাবলীর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মত ভুলের সম্ভবনা থেকে যায়।

কল্পিত চিত্রের প্রতি আসক্তির কারণে খৃষ্টানরা মানুষ সদৃশ অগণিত চিত্র অঙ্কন, খোদাই এবং ঢালাই করে সেগুলিকে স্রষ্টার প্রতিচ্ছবি নাম দিয়েছে। এইগুলি জনগণের মধ্যে যিশুখৃষ্টের দেবত্বের স্বীকৃতি আদায় করতে সাহায্য করেছে। স্রষ্টা মানুষের মত, একবার এই কল্পনা গ্রহণযোগ্য হলে, যিশুখৃষ্টকে স্রষ্টা হিসাবে গ্রহণ করতে সত্যিকার কোন সমস্যা দেখা দেয় না।

৪) আল্লাহর নামের এককত্ব বজায় রাখার আরও অর্থ হ’ল যদি নামে আগে আব্দ’ (অর্থ ভৃত্য অথবা বান্দা) সংযোজিত না করা হয় তাহলে তার সৃষ্টিকে আল্লাহর কোন নামে নামকরণ করা যাবে না। কিস্তু ‘রাউফ’ এবং ‘রহিম’ এর মত বহু স্বর্গীয় নাম মানুষের নাম হিসাবে অনুমোদিত কারণ রাসুল (সঃ) কে উল্লেখ করতে যেয়ে আল্লাহ এই ধরনের কিছু নাম ব্যবহার করেছেন। হিসাবে স্বর্গীয় গুণে গুনাম্বিত করেছে। এঁটা করতে যেয়ে তারা সেই সব প্রতিদ্বন্দ্বী সৃষ্টি করেছে যারা স্রষ্টার অদ্বিতীয় গুণাবলির অংশীদার এবং আল্লাহর সমসাময়িক।

 নিশ্চয় তোমাদের নিজদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন, তা তার জন্য কষ্টদায়ক যা তোমাদেরকে পীড়া দেয়। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, (রাউফ) পরম দয়ালু (রহিম)।   (সূরা আত্-তওবা ৯: ১২৮)

কিস্তু ‘আর-রাউফ’ (যিনি সবচেয়ে সমবেদনায় ভরপুর) এবং ‘আর রহিম’ (সবচেয়ে ক্ষমাশীল) মানুষের ব্যাপারে তখনই ব্যবহার করা যাবে যখন নামের আগে আবদ ব্যবহার করা হবে, যেমন আব্দুর-রাউফ অথবা আব্দুর রহিম। আর-রাউফ এবং আর রহিম এমন এক পূর্ণতার প্রতিনিধিত্ব করে যা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য। তেমনিভাবে,আব্দুর-রাসূল (বার্তাবাহকের গোলাম), আব্দুন-নবী (রাসুলের গোলাম), আব্দুল-হুসাইন (হুসাইনের গোলাম) ইত্যাদি নামগুলি নিষিদ্ধ, কারণ এখানে মানুষ নিজেদেরকে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের গোলাম হিসাবে ঘোষণা করেছে। এই মতবাদের ভিত্তিতে, রাসুল (সঃ) মুসলিমদের তাদের অধীনস্থদের ‘আবদী’ (আমার গোলাম) অথবা ‘আমাতী’ (আমার বাঁদী) বলে উল্লেখ করতে নিষেধ করেছেন।

তাওহীদ আল উলুহিয়্যা বা  ইবাদাহ্ (আল্লাহর ইবাদতের এককত্ব বজায় রাখা)

প্রথম দুই শ্রেণীর তাওহীদের ব্যাপক গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা থাকলেও শুধুমাত্র সেগুলির উপর দৃঢ় বিশ্বাসই তৌহিদের ইসলামী প্রয়োজনীয়তা পরিপূরণে যথেষ্ট নয়। ইসলামী মতে তৌহিদকে পরিপূর্ণতা দেয়ার জন্য তৌহিদ আর-রবুবিয়াহ এবং আল্-আছমা ওয়াছ-ছিফাত অবশ্যই এদের পরিপূরক তৌহিদ আল্-ইবাদাহ্-র সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে। এই বিষয়টি যে ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত তা’হল আল্লাহ নিজেই পরিস্কার ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে রাসুলের সময়কার মুশরিকগণ (পৌত্তলিকগণ) তৌহিদের প্রথম দুই শ্রেণীর বহু বিষয় সত্য বলে স্বীকার করেছিল। কুরআনে আল্লাহ রাসুল (সঃ)-কে পৌত্তলিকদের বলতে বলেছেন,

বলআসমান ও যমীন থেকে কে তোমাদের রিয্ক দেনঅথবা কে (তোমাদের) শ্রবণ ও দৃষ্টিসমূহের মালিকআর কে মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন আর জীবিত থেকে মৃতকে বের করেনকে সব বিষয় পরিচালনা করেনতখন তারা অবশ্যই বলবেআল্লাহ। সুতরাংতুমি বলতারপরও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না? (সুরা ইউনুছ ১০: ৩১)

আর তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।’ তবু তারা কীভাবে বিমুখ হয়? (সুরা আয-যুখরুফ ৪

আর তুমি যদি তাদেরকে প্রশ্ন কর,কে আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন,অতঃপর তা দ্বারা যমীনকে তার মৃত্যুর পর সঞ্জীবিত করেন’? তবে তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। (সুরা আল-আনকাবুত ২৯: ৬৩

পূর্বে উল্লেখকৃত আয়াতে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কাফেররা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, রাজত্ব ও ক্ষমতা সম্বন্ধে জ্ঞাত ছিল। প্রকৃতপক্ষে, ভীষণ প্রয়োজন এবং দুর্যোগের সময় তারা বিশ্বস্ততার সঙ্গে হজ্জ, দান, পশু বলি, মানত এমনকি উপাসনাও করত। এমনকি তারা ইব্রাহিমের ধর্ম অনুসরণ করছে বলেও দাবি করত। ঐ ধরণের দাবীর কারণে আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করলেনঃ

ইব্রাহিম ইয়াহুদীও ছিল নাখৃস্টানও ছিল না,সে ছিল একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণকারী এবং সে মুশরিকদের অস্তুর্ভুক্ত ছিল না। (সুরা আল-ইমরান ৩ঃ৬৭)

মক্কাবাসীরে তৌহিদ সম্পর্কে স্বীকারোক্তি এবং আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা সত্বেও একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি তারা অন্যান্য দেবদেবীর উপাসনা করার কারণে আল্লাহ তাদেরকে নাস্তিক (কাফের) এবং পৌত্তলিক (মুশরিক) হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন।

ফলে তৌহিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হ’ল তৌহিদ আল-ইবাদাহ অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতে এককত্ব বজায় রাখা। যেহেতু একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত প্রাপ্য এবং মানুষের ইবাদতের ফল হিসাবে একমাত্র তিনিই মঙ্গল মঞ্জুরী করতে পারেন,সেজন্য সকল প্রকার ইবাদত একমাত্র আল্লাহকে উদ্দেশ্য করেই করতে হবে। অধিকস্তু,মানুষ এবং স্রষ্টার মধ্যে যে কোন ধরণের মধ্যস্থতাকারী অথবা যোগাযোগকারীর প্রয়োজন নেই। আল্লাহ একমাত্র তাঁকে উদ্দেশ্য করেই ইবাদতের গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং এটাই সকল পয়গম্বর কর্তৃক প্রচারিত বার্তার সারমর্ম। আল্লাহ বলেছেন-

আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদাত করবে। (সুরা আয-যারিয়াত ৫১: ৫৬)

আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং পরিহার কর তাগূতকে।  (সুরা আন-নাহল ১৬: ৩৬)

সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে উপলদ্ধি করা মানুষের সহজাত ক্ষমতার উর্দ্ধে। মানুষ একটি সসীম সৃষ্টিকর্ম এবং তার নিকট হতে অসীম স্রষ্টার ক্রিয়াকান্ড সম্পুর্ণ যুক্তিসঙ্গতভাবে উপলদ্ধি আশা করা যায় না। এই কারণে স্রষ্টা তাঁকে ইবাদত করা মানুষের স্বভাবের একটি অংশ হিসাবে তৈরি করেছেন। সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্বন্ধে পরিস্কার করে বুঝানোর জন্য তিনি পয়গম্বারদের এবং মানসিক ক্ষমতার বোধগম্য কিতাবসমূহ প্রেরণ করেছিলেন। স্রষ্টার ইবাদত (ইবাদাহ) করা উদ্দেশ্য এবং পয়গম্বারদের প্রার্থনা বার্তা ছিল একমাত্র সৃষ্টাকে ইবাদত করা, তৌহিদ আল ইবাদাহ। এর কারণে আল্লাহ ছাড়া অথবা আল্লাহসহ অন্যকে ইবাদত করা কঠিন গুনাহ, র্শিক। যে সূরা আল ফাতিহা, মুসলিম নরনারীদের নামাজে প্রতিদিন অন্ততপক্ষে সতেরবার পড়তে হয় সেই সূরার চতুর্থ আয়াত উল্লেখ করে ‘‘আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং একমাত্র তোমার কাছেই আমবা সাহায্য চাই।’’ এই বিবৃতি থেকে পরিস্কার হয়ে যায়, সকল প্রকার ইবাদত আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে করতে হবে যিনি সাড়া দিতে পারেন।

রাসূল (সাঃ) এককত্বের দর্শন দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে বলেছেনঃ তুমি যদি ইবাদতে কিছু চাও তাহলে শুধু আল্লাহর নিকট চাও এবং তুমি যদি সাহায্য চাও তাহলে শুধু আল্লাহর নিকট চাও’’ প্রয়োজনীয় এবং আল্লাহর নিকটবর্তীতা আরও দৃঢ়ভাবে প্রকাশ পায়
কুরআনের বহু আয়াতে। উদাহরনস্বরূপঃ

আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেআমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেইযখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে। (সূরা আল বাকারা ২: ১৮৬)

আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তাও আমি জানি। আর আমি  তার গলার ধমনী হতেও অধিক কাছে। (সূরা কাফ ৫০: ১৬)

তাওহীদ আল ইবাদাহ এর স্বীকৃতি,বিপরীতভাবে সকল প্রকার মধ্যস্থতাকারী অথবা আল্লাহর সঙ্গে অংশীদারের সম্পৃক্ততার অস্বীকৃতি অপরিহার্য করে তোলে। যদি কেউ জীবিত ব্যক্তিদের জীবনের উপর অথবা যারা মারা গিয়েছে তাদের আত্মার উপর প্রভাব বিস্তারের জন্য মৃত্যের কাছে প্রার্থনা করে, তারা আল্লাহর সঙ্গে একজন অংশীদার যুক্ত করে। এই ধরণের প্রার্থনা আল্লাহর পাশাপাশি অন্যের উপাসনা করার মত। রাসূল (সঃ) সুস্পষ্টভাবে বলেছেনঃ “প্রার্থনাই ইবাদত” যদি কেউ রাসূল (সাঃ) অথবা তথকথিত আউলিয়া,জিন অথবা ফেরেশতাগণের নিকট সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করে অথবা প্রার্থনাকারীর পক্ষ হয়ে তাদেরকে সাহায্য করতে অনুরোধ করে তাহলে তারাও শির্ক করে। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ট এবং মহিমান্বিত বলেছেনঃ

সে (ইবরাহীম) বলল, ‘তাহলে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর ইবাদাত কর,যা তোমাদের কোন উপকার করতে পারে না এবং কোন ক্ষতিও করতে পারে না’? (সূরা আল আম্বিয়া ২১: ৬৬)

আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাক তারা তোমাদের মত বান্দা।  (সূরা আল আরাফ ৭: ১৯৪)

যদি কেউ রাসূল (সাঃ) অথবা তথকথিত আউলিয়া, জিন অথবা ফেরেশতাগণের নিকট সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করে অথবা প্রার্থনাকারীর পক্ষ হয়ে তাদেরকে সাহায্য করতে অনুরোধ করে তাহলে তারাও শির্ক করে। মূর্খ লোকেরা যখন আব্দুল কাদের জিলানীকে গাওছি আজম উপাধীতে ভূষিত করে তখন তৌহিদের এই নিয়মে শির্ক করে। উপাধিটির আক্ষরিক অর্থ, মুক্তি প্রাপ্তির প্রধান উৎস; এমন একজন যিনি বিপদ হতে রক্ষা করার চেয়ে সবচেয়ে উপযুক্ত অথচ এই ধরণের বর্ণনা শুধু মাত্র আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য। দূর্ঘটনা ঘটলে কেউ কেউ আবদুল কাদিরেকে এই উপাধিতে ডেকে তাঁর সাহায্য এবং আত্মরক্ষা কামনা করে, যদিও আল্লাহ আগেই বলেছেনঃ

“আল্লাহ তোমাকে ক্লেশ দান করলে তিনি ব্যতীত উহা মোচনকারী আর কেউ নাই।” (সূরা আল-আন্আম ৬: ১৭)

কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, যখন মক্কাবাসিদের তাদের মূর্তিপূজার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হলে তারা উত্তর দিলঃ

“আমরা তাদের ইবাদত করি যাহাতে তাহারা আমাদিগকে আল্লাহর কাছাকাছি পৌছায়।” (সূরা আয্-যুমার ৩৯: ৩)

মূর্তিগুলিকে শুধুমাত্র মধ্যস্থতাকারী হিসাবে ব্যবহার করলেও আল্লাহ তাদের আচার অনুষ্ঠানের কারণে তাদের পৌত্তলিক বলেছেন। মুসলিমদের মধ্যে যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ইবাদত করার প্রতি জোর দেয় তারা ভালভাবে এ বিষযে চিন্তা করে দেখতে পারেন।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ইবাদতে (ইবাদাহ্) শুধু রোজা রাখা, যাকাত প্রদান, হজ্জ এবং পশু কোরবানী করা ছাড়াও অনেক কিছু অন্তুর্ভুক্ত। এর মধ্যে ভালবাসা, বিশ্বাস এবং ভয়ের মত আবেগ অন্তর্ভুক্ত, যেগুলির বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে এবং যা শুধুমাত্র স্রষ্টার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হতে হবে। আল্লাহ এই সব আবেগের বাড়াবাড়ি সম্বন্ধে সাবধান করে দিয়ে উল্লেখ করেছেনঃ

আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তাদেরকে আল্লাহকে ভালবাসার মত ভালবাসে। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালবাসায় দৃঢ়তর। (সূরা আল-বাকারা ২ :১৬৫)

তোমরা কেন এমন কওমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর না, যারা তাদের কসম ভঙ্গ করেছে এবং রাসূলকে বহিষ্কার করার ইচ্ছা পোষণ করেছে, আর তারাই প্রথমে তোমাদের সাথে আরম্ভ করেছে। তোমরা কি তাদেরকে ভয় করছ? অথচ আল্লাহ অধিক উপযুক্ত যে, তোমরা তাঁকে ভয় করবে, যদি তোমরা মুমিন হও। (সুরা আত্-তাওবা ৯: ১৩)

ইবাদত (ইবাদাহ্) শব্দের অর্থ সম্পুর্ণভাবে আত্মসমর্পণ এবং আল্লাহকে চুড়ান্ত আইন প্রণেতা হিসাবে গণ্য করা। কাজেই স্বর্গীয় আইনের (শারীয়াহ) উপর ভিত্তি না করে ধর্মনিরপেক্ষ আইন বিধান বাস্তবায়ন স্বর্গীয় আইনের প্রতি অবিশ্বাস এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করার পর্যায়ে পড়ে। এই ধরনের বিশ্বাস আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের উপাসনা করার নামান্তর (শির্ক)। আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেনঃ

  আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে ফয়সালা করে না, তারাই কাফির। (সুরা আল-মায়েদা ৫: ৪৪)।

সাহাবী আদি ইবনে হাতিম, যিনি খৃস্টান ধর্ম হতে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন, রাসুল (সাঃ) কে কুরআনের আয়াত পড়তে শুনেন। তারা আল্লাহকে ছেড়ে  তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের  রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোন (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র।(সুরা আত্-তওবা ৯:৩১)

তিনি রাসুল (সাঃ) কে বললেন,“নিশ্চয়ই আমরা তাদের উপসনা করি না।” রাসূল (সঃ) তার দিকে তাকিয়ে বললেন “আল্লাহ যা কিছু হালাল করেছেন তারা কি তা হারাম ঘোষনা করেনি এবং তোমরা সকলে তা হারাম করনি এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা কি তারা হালাল করেনি এবং তোমরা সকলে তা হালাল করনি?” তিনি উত্তরে বললেন নিশ্চয়ই আমরা তা করেছি। রাসূল (সঃ) তখন উত্তর দিলেন, “ঐ ভাবেই তোমরা তাদের উপসনা করেছিলে।”(আত তিরমিজি কর্তৃক সংগৃহীত)

অতএব তাওহীদ আল ইবাদাহ এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হল শরীয়াহ বাস্তবায়ন, বিশেষ করে যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা মুসলিম। বহু তথাকথিত মুসলমান দেশ, যেখানে সরকার আমদানীকৃত গনতান্ত্রিক অথবা সমাজতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত এবং যেখানে স্বর্গীয় আইন সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত অথবা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে ইসলামি আইন চালু করতে হবে। অনুরূপভাবে মুসলিম দেশসমূহ যেখানে ইসলামি আইনকানুন চালু রয়েছে সেখানেও শরীয়াহ আইনকানুন প্রবর্তন করতে হবে কারণ জীবনের সকল ক্ষেত্রে এই আইনকানুন সম্পর্কযুক্ত। মুসলিম দেশে শরীয়াহ আইনের পরিবর্তে অনৈসলামিক আইনকানুনের স্বীকৃতি হল শির্ক এবং এটা একটি কুফরী কাজ। যাদের ক্ষমতা আছে তাদের অবশ্যই এই অনৈসলামিক আইনকানুন পরিবর্তন করা উচিত। যাদের সে ক্ষমতা নেই তাদের অবশ্যই কুফর এর বিরুদ্ধে এবং শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের জন্য সোচ্চার হওয়া উচিত। যদি এটাও সম্ভব না হয়, তাহলে আল্লাহর সস্তুষ্টি ও তৌহিদ সমুন্নত রাখার জন্য অনৈসলামিক সরকারকে আন্তরিকভাবে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করতে হবে। জেনে রাখা প্রয়োজন যে আল্লাহ একক ইলাহ হিসেবে নিম্নের ইবাদতগুলি একমাত্র আল্লাহরই প্রাপ্য। ইবাদতের প্রকার সমূহ যা আল্লাহ তাআ’লা নির্দেশিত করেছেন তা হচ্ছেঃ

(ক) (আল- ইসলাম)- আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে সমর্পণ করা।
(খ) (আল-ঈমান)- বিশ্বাস স্থাপন করা।
(গ) (আল-ইহসান)-নিষ্ঠার সাথে কাজ করা। দয়া-দাক্ষিণ্য ও সহানুভূতি প্রদর্শন, উপকার সাধন করা।
(ঘ) (আদ-দো’য়া) প্রার্থনা, আহবান করা।
(ঙ) (আল-খাওফ) ভয়-ভীতি প্রদর্শন করা ।
(চ) (আর-রাজা) আশা-আকাংখা করা ।
(ছ) (আত্-তাওয়াক্কুল) নির্ভরশীলতা, ভরসা করা ।
(জ) (আর-রাগ্বাহ) অনুরাগ, আগ্রহ।
(ঝ) (আর-রাহ্বাহ) ভয় ভীতি।
(ঞ) (আল-খূশূ) বিনয়-নম্রতা।
(ট) (আল-খাশিয়াত) অমংগলের আশংকা।
(ঠ) (আল- ইনাবাহ) আল্লাহর অভিমুখী হওয়া, তাঁর দিকে ফিরে আসা।
(ড) (আল-ইস্তে’আনাত) সাহায্য প্রার্থনা করা।
(ঢ) (আল-ইস্তে-আযা) আশ্রয় প্রার্থনা করা।
(ণ) (আল-ইস্তেগাসাহ) নিরুপায় ব্যাক্তির বিপদ উদ্ধারের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা।
(ত) (আয্-যাবাহ) আত্ব ত্যাগ বা কুরবানী করা।
(থ) (আন্-নযর) মান্নত করা।

এগুলি এবং অন্যান্য যে পদ্ধতিসমূহের আদেশ ও নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন সবকিছুই তাঁর সন্তুষ্টি বিধানের জন্যে। উপোরোল্লিখিত ইবাদতগুলির কোন একটি যদি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য নিবেদন করে তবে সে মুশরিকে পরিণত হবে।

 

 

দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব থেকে কোন মুমিন নর-নারী’ই মুক্ত নয়

দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব থেকে কোন মুমিন নর-নারী’ই মুক্ত নয়
দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব থেকে কোন মুমিন নর-নারী’ই মুক্ত নয়

সমস্ত প্রশংসা সেই মহান সত্তা ও প্রতিপালকের, যিনি তাঁর স্বইচ্ছাতেই মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন, এবং তাঁর জমিনে তাঁর’ই প্রতিনিধি হিসেবে সমস্ত মানব জাতিকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন।
অসংখ্য দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক মানবতার মহানায়ক আল্লাহর প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতি, তাঁর সহচরবৃন্দের প্রতি এবং কিয়ামত পর্যন্ত সে সকল মু’মিন নর-নারী তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণের মাধ্যমে উত্তমরূপে জীবন-যাপন করবেন, তাদের প্রতি।

সুমহান আল্লাহ ও দয়াময় প্রতিপালক সমস্ত মানবজাতিকে সৃষ্টি করে এক মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। আর সে উদ্দেশ্য হচ্ছেঃ আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করা। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর ঘোষণা ছিলো এ রকমঃ
“এ পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে, সমস্ত কিছুই তিনি (পরম সৃষ্টিকর্তা) তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর সপ্ত আকাশ সুবিন্যস্ত করেন এবং তিনি সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী। এবং (তোমরা সকলেই সেই সময়ের কথা স্বরণ কর) যখন তোমার প্রভূ (আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা) ফেরেশতাগণকে বললেনঃ নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে (আমার) খলিফা (বা প্রতিনিধি) সৃষ্টি করবো।” (সূরা বাকারাঃ ২৯-৩০)

তারপর মানব জাতিকে সেই ঘোষণা অনুযায়ী সৃষ্টি করে তাদেরকে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্যে দুনিয়াতে প্রেরণের পূর্বেই সমস্ত রূহ এর নিকট থেকে অঙ্গীকারও নিয়েছেন। আর সে ব্যপারে মহান আল্লাহ সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেনঃ
“(হে মানবজাতি! তোমরা সেই সময়ের কথা স্মরণ কর) যখন তোমার প্রতিপালক বানী আদমের পৃষ্ঠদেশ হতে তাদের বংশধরকে বের করলেন এবং তাদেরকেই (অর্থাৎ সমস্ত মানব রূহকেই) তাদের (পরস্পরকে পরস্পরের) উপর- সাক্ষী করে জিজ্ঞেস করলেন: আমি কী তোমাদের প্রতিপালক নই? তারা (সমস্ত রূহই) সমস্বরে উত্তর দিলো: হ্যাঁ! আমরা (এ ব্যাপারে পরস্পরের) সাক্ষী থাকলাম। (আর এই স্বীকৃতি ও সাক্ষী বানানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে) যাতে তোমরা কিয়ামতের দিন (দুনিয়ার কৃতকর্মের হিসাব দেয়ার সময়) বলতে না পারো-আমরা এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অনবহিত ছিলাম।” (সূরা আ’রাফঃ১৭২)

অতঃপর মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা’য়ালা বিশেষ একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই রূহগুলোকে এক এক করে মাতৃগর্ভের ভ্রুণের মধ্যে প্রেরণ করছেন। এবং এক নিরাপদ আঁধারে রূহসংযুক্ত সেই ভ্রুণটিকে লালন-পালন করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে মাতৃগর্ভ হতে জমিনে পাঠিয়ে থাকেন। এ ব্যপারেই মহান আল্লাহ বলছেনঃ

“আমিতো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকা হতে; অতঃপর আমি ওকে শুক্রবিন্দু রূপে স্থাপন করেছি (মাতৃগর্ভে) নিরাপদ আঁধারে। পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি রক্তপিণ্ডে; অতঃপর রক্তপিণ্ডকে পরিণত করি গোশত পিণ্ডে এবং গোশত পিণ্ডকে পরিনত করি অস্থিপঞ্জরে; অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে ঢেকে দেই গোশত দ্বারা। অবশেষে ওকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে; অতএব সর্বোত্তম স্রোষ্টা আল্লাহ কত মহান।” (সূরা মু’মিনুনঃ১২-১৪)

এ ব্যপারে একটি হাদীসের বর্ণনাঃ “আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ সত্যবাদী ও সত্যের বাহক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলে তার মাতৃগর্ভে চল্লিশদিন ধরে। অতঃপর সে শুক্রবিন্দু থেকে (চল্লিশ দিনে) জমাট বাঁধা রক্তপিণ্ডে পরিনত হতে থাকে। অতঃপর রক্তপিণ্ড হতে (চল্লিশ দিন পর্যন্ত) গোশত পিণ্ডে পরিণত হতে থাকে। অতঃপর {ভ্রুণটির বয়স যখন ১২০ (একশত বিশ) দিন হয় তখনি} আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা একজন ফেরেশতা পঠিয়ে তাকে চারটি বিষয়ে লিপিবদ্ধ করতে বলেন। অতঃপর তার মধ্যে “রূহ” ফুকে দেয়া হয়।………”(সহিহ আল বুখারী)
তারপর মহান আল্লাহ সেই মাতৃগর্ভের ভ্রুণটিকে কখনও পুর্ণাঙ্গ মানব শিশুতে পরিণত করে নির্দিষ্ট সময়ে জীবিত অবস্থায় জমিনে প্রেরণ করেন। আবার কাউকে মৃত অবস্থায় মাতৃগর্ভ থেকে বের করেন। এ ব্যাপারেই মহান আল্লাহ বলছেনঃ
“হে মানব জাতি! পুনরুত্থান সম্বন্ধে যদি তোমরা সন্দিহান হও, তবে অনুধাবন কর; আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি মৃত্তিকা হতে; অতঃপর শুক্র হতে; অতঃপর রক্তপিণ্ড হতে; অতঃপর পূর্ণাকৃতি বা অপূর্ণাকৃতি গোশতপিণ্ড হতে; তোমাদের নিকট (আমার বিধান) ব্যক্ত করবার জন্য। আমি যা ইচ্ছা করি তা এক নির্দিষ্ট কালের জন্য মাতৃগর্ভে স্থিত রাখি। অতঃপর তোমাদেরকে শিশুরূপে (মাতৃগর্ভ হতে) বের করি। পরে যাতে তোমরা পরিণত বয়সে উপনীত হও; তোমাদের মধ্যে কারো কারো (অল্প বয়সে) মৃত্যু ঘটানো হয়, এবং তোমাদের মধ্যে কাউকে প্রত্যাবৃত্ত করা হয় অকর্মণ্য (বৃদ্ধ) বয়সে, যার ফলে তারা যা কিছু জানতো সে সম্বন্ধে তারা সজ্ঞান থাকে না।” (সূরা হাজ্জঃ ৫)

এভাবেই একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানব শিশুটি যখন একদিন ইসলামের ফিতরাতের উপর জমিনে পদার্পন করেন, একটি বয়সে এসে আল্লাহর হুকুমে শিশুটির জবান খুলে যায়। যখন সে কথা বলতে শিখে তখন তার পিতা-মাতা মুসলিম হলে শিশুটিকে সর্বপ্রথম আল্লাহর পবিত্র কালেমা পড়িয়ে মু’মিন বাহিনীতে ভর্তি করে দিয়ে তাকে মু’মিনের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। কিন্তু তখন সেই শিশুটি কালেমা সম্পর্কে কোন কিছুর ধারণা না পেলেও একদিন সেই শিশুটি একটি পরিণত বয়সে উপনীত হয় এবং মু’মিনের বিধি-বিধান সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা লাভ করতে পারে। এবার সেই বালকটি কালেমার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে যে অঙ্গীকার করা হয়েছে সেটাও বুঝতে পারেন। সে বুঝতে পারে যে, সে এক কঠিন শর্তে আল্লাহর সাথে একটি চুক্তিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আর সেই চুক্তিটি হচ্ছেঃ

“লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ দাহু লা-শারীকালাহ, ওয়াআসহাদু আন্না-মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”

অর্থঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই। তিনি এক ও একক, তার কোন শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল”।

এই অঙ্গীকারটা একজন মু’মিনের জন্য দ্বিতীয় চুত্তি। যার প্রথম চুক্তিটি ছিলো দুনিয়াতে আসার পূর্বে। সর্বশেষ কালেমার মাধ্যমে যে চুক্তিটি সম্পাদিত হলো, এটি সেনা বাহিনীতে ভর্তি হয়ে প্রশিক্ষণ শেষে শপথ গ্রহণের মতই আর একটি চুক্তি বা অঙ্গীকার।

আমাদের দেশে একজন সাধারণ কিশোর সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যখন প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শেষ করেন, তখন তাকে যে উদ্দেশ্যে ভর্তি করা হয়ে থাকে, সেই কর্মসম্পাদন করার জন্য তারা স্ব স্ব ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করে কলিজা ফাঁটা গগন বিদারী চিৎকারের মাধ্যমে প্রকাশ্য জনসন্মুখে শপথ নিয়ে বলতে থাকেনঃ
**“আমি, (এ স্থানে নিজের সৈনিক নং পদবী / পেশা নাম এবং পিতার নাম উল্লেখ পূর্বক) সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে, সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ করিতেছি যে,

**আমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের সংবিধান এবং রাষ্ট্রপতির প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব;

**আমি আমার অপরিহার্য কর্তব্য মনে করিয়া আমার উপর ন্যস্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্তব্য, আমি সততা ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব; এবং আমার প্রতি জ্বল স্থল ও আকাশ পথে যেখানেই যাইবার আদেশ করা হইবে, সেখানেই যাইব;

**আমার জীবন বিপন্ন করিয়াও আমার উপর নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কর্তব্যরত যে কোন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ পালন ও মান্য করিব।”

এই পবিত্র শপথ রক্ষার জন্য একজন সৈনিক অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করে নিজের পিঠের উপর ৪০/৫০ কেজি ওজনের ভারী বোঝা বহন করে দিনের পর রাত, রাতের পর দিন এবং মাসের পর বছর ধরে উঁচু-নিচু দুর্গম পাহাড়ী পথ অতিক্রম করে। মাইলের পর মাইল পাথারের পর পাথার, ঝোপ-জঙ্গল, গিরীপথ ও বন্ধুরপথ অতিক্রম করে। এই শপথ রক্ষার জন্য নিজের পিঠে ভারী বোঝা বহন করে আকাশ যানের উপর থেকে লম্ফ দিয়ে জমিনে পরে, সাগরের হিংস্র জন্তু জানোয়ারের তোয়াক্কা না করে গভীর সাগরে ডুব দেয়। প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি ও কলিজা ফাঁটা রোদ্রের প্রখর তাপদাহ উপেক্ষা করে, নিজের জীবনের নিশ্চিত মৃত্যু ঝুকি নিয়েও শত্রু সৈন্যের বুহ্য অভ্যন্তরে ঢুকে পরে। সৈনিকরা এই সমস্ত কষ্ট করার উদ্দেশ্য, শুধু মাত্র একটি কারণে। আর তা হচ্ছে: তারা যে দেশ-জাতি তথা সরকার এবং রাষ্ট্রীয় সংবিধানের উপর আনুগত্যের জন্য ওয়াদাবদ্ধ, সেই ওয়াদা পালন করা।

এই যদি সাধারণ একজন সৈনিকের বেলায় হতে পারে, তাহলে যিনি সমস্ত মানব জাতির সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা এবং মানুষের যাবতীয় কল্যাণের পথ দ্রোষ্টা। সেই মহান প্রভূর নিকট যে অঙ্গীকার বা চুক্তি করা হয়েছে, সেগুলো পালনের জন্য আমরা মু’মিনরা কে কতটুকু কাজ করছি? সকলেই একবার নিজে নিজে চিন্তা করে দেখুন তো?

অনেকেই হয়তো বলতে পারেন যে, মু’মিনরা কার আনুগত্য করবে? সে সম্পর্কে হয়তো কোন দিক নির্দেশনা দেয়া হয়নি। তাই বলছিঃ একজন মানুষ যখন কালেমা পড়ে ঈমান গ্রহণ করে ইসলামে প্রবিষ্ট হন, তখন তারাও কারো না কারো আনুগত্যের কাছে দায়বদ্ধ হন। তা নাহলে তিনি মু’মিন থাকতে পারবেন না। আর সে ব্যাপারেই মহান আল্লাহ আনুগত্যের নির্দেশ দিয়ে বলছেনঃ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর অনুগত হও ও রাসূলের অনুগত হও এবং তোমাদের মধ্যে (কুর’আন সুন্নাহর আলোকে) আদেশদাতাগণের। অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়, তবে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তীত কর, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করে থাকো; এটাই কল্যাণকর ও শ্রেষ্ঠতম অবস্থান।” (সূরা নিসাঃ ৬৯)

আবার অনেকেই ভাবতে পারেন যে, মু’মিনদের আবার আলাদা সংবিধান কি? যে মু’মিন যে রাষ্ট্রে বসবাস করেন, সেই রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিগণ যে সংবিধান তৈরী করেন সেটাই তো তাদেরও সংবিধান। তাই মু’মিনরা কোন সংবিধানের অনুগত থাকবে বা অনুসরণ করবে, সে সম্পর্কেও মহান আল্লাহ বলছেনঃ
“আর (এমনিভাবে) আমি এই কিতাব (আল-কুরআনকে সংবিধান হিসেবে) অবতীর্ণ করেছি, যা বরকতময় ও কল্যাণময়! সুতরাং তোমরা এটাকে অনুসরণ করে চলো। এবং এর বিরোধিতা হতে বেঁচে থাকো। হয়তো (এই কুরআন অনুসরণের মাধ্যমে) তোমাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করা হবে।” (সূরা আন’আমঃ১৫৫)।

আর যে বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা মু’মিনদেরকে দুনিয়ায় পঠিয়ে থাকেন, আর তা হচ্ছে, আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানব সমাজে তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানব কল্যাণ সাধন করা। আর এ ব্যাপারেই মহান আল্লাহ বলছেনঃ
“(হে মু’মিনগণ!) তোমরাই মানবমন্ডলীর জন্যে শ্রেষ্ঠতম সম্প্রদায়রূপে সমুদ্ভূত হয়েছো; তোমরা (মানবজাতিকে) ভালো কাজের আদেশ কর ও মন্দ কাজের নিষেধ কর এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো…… (সুরা আল-ইমরানঃ১১০)
আর এই কাজের জন্য মু’মিন নর-নারী সমভাবেই দায়ী। এ ব্যপারেই মহান আল্লাহ বলছেনঃ
“আর মুমিন পুরুষরা ও মু’মিনা নারীরা হচ্ছে পরস্পর একে অন্যের বন্ধু, তারা (যার যার সামাজিক ভূবনে মানব জাতিকে) সৎ বিষয়ের আদেশ দেয় এবং অসৎ বিষয় হতে নিষেধ করে, আর নামাযের পাবন্ধি করে, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ মেনে চলে। এসব লোকের প্রতি আল্লাহ অবশ্যই করুণা বর্ষণ করবেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় ক্ষমতাবান, হিকমতওয়ালা।” (সূরা আত তাওবাঃ ৭১)

সৈনিকরা দেশ ও মানব সেবার জন্য কাজ করলে দেশের সরকার তাদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকেন, যেমনঃ যার যার পদমর্যাদা অনুযায়ী মাসের শেষে নির্দিষ্ট পরিমানের একটা পারিশ্রমিক, বিনা পয়সায় থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসা সুবিধা, অকর্মন্ন বয়সে পেনশন সুবিধা ইত্যাদি।

তদ্রুপ মু’মিন নর-নারীরা মহান আল্লাহর নির্দেশ মত কাজ করলে, তাদের জন্যেও রয়েছে প্রচুর সুযোগ সুবিধা। এ ব্যাপারেই মহান আল্লাহ বলছেনঃ
“আল্লাহ (সৎকর্মশীল) মু’মিন পুরুষ ও মুমিনা নারীদেরকে (তাদের সৎ কর্মের পুরস্কার হিসেবে) এমন উদ্যানসমূহের ওয়াদা দিয়ে রেখেছেন, যেগুলোর নিম্নদেশে বইতে থাকবে নহরসমূহ, যে (উদ্যান) গুলোর মধ্যে তারা অনন্তকাল অবস্থান করবে, আরও (ওয়াদা দিয়েছেন) ঐ উত্তম বাসস্থানসমূহের যা চিরস্থায়ী উদ্যানসমূহে অবস্থিত হবে, আর (এগুলোর চেয়েও) আল্লাহর সন্তুষ্টি হচ্ছে সর্বাপেক্ষা বড় (নিয়ামত), এটা হচ্ছে অতি বড় সফলতা।” (সূরা আত তাওবাঃ ৭২)

সৈনিকরা যেমনিভাবে তাদের দায়িত্ব পালন না করলে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা হতে বঞ্চিত হন, এছাড়াও ওয়াদা খেলাপের কারণে কঠিন শস্তি পেয়ে থাকেন। তদ্রুপ কোন ব্যক্তি মু’মিন হওয়ার পরেও যদি তিনি আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানব কল্যাণ সাধনের জন্য চেষ্টা না করেন, তাহলে তিনিও কোনক্রমেই আল্লাহর ঘোষিত পুরস্কার প্রাপ্তির যোগ্য হতে পারবেন না। বরংচ দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে ওয়াদা খেলাপকারী বা শপথ ভঙ্গকারী হিসেবে অবশ্যই তাকেও কঠিন শাস্তি পেতে হবে।

সুতরাং হে আমার প্রাণ প্রিয় মু’মিন ভাই ও বোনগণ! আসুন আমরা পবিত্র কুর’আনুল কারীম এবং সহীহ হাদীস থেকে আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভালো ভাবে জানার চেষ্টা করি. এবং জানার পর থেকেই আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হয়ে মহান আল্লাহর অনুগত বান্দা-বান্দী হিসেবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করি।

দয়াময় প্রতিপালক ও সুমহান আল্লাহ আমাদের সমস্ত দুনিয়ার মু’মিন নর-নারীকেই তাঁর দেয়া দায়িত্ব পালনের পথ সহজ করে দিন এবং আমাদের সকলকেই দ্বীনের সৈনিক হিসেবে কবুল করে নিয়ে গোটা দুনিয়ার জমিনে তাঁর দ্বীন বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানব কল্যাণ সাধন করার তাওফীক দান করুন। আমিন॥

নামায প্রতিষ্ঠার সময় মুসল্লিদের মনোযোগ আকর্ষণ

01 মৌসুমী মুসল্লীদের আপনি সহজেই চিনতে পারেন, তারা শুধু জানাযা, জুমুয়া ও ঈদের নামাযেই শরীক হয়ে থাকে। তাদেরকে নামাযে সৌভাগ্যের চূড়ায় দেখতে পাবেন। ইমাম সাহেব যদি নামাযে উচ্চ স্বরে ছোট কোন কিরাত পড়েন, অথবা এমন কিরাত যা প্রসিদ্ধ, তখন এই মুসল্লি সূরাটি মুখস্ত করে নিয়ে ইমামের পেছনে স্বরবে পড়া আরম্ভ করে দেয়। যেন তিনি ইমাম সাহেবের পড়ার প্রতিধ্বনি আওড়াচ্ছেন। এমনকি সে যেন বলেই ফেললো যে, আমি মুখস্ত করে ফেলছি। অতঃপর সে ইমাম সাহেব কিরাত শুরু করার ২/১ সেকেণ্ড পূর্বে কিরাত শুরু করে। যেন মুসল্লিগণ মনে করে আমরা মাশারী রাশেদ আল আফাসীর পেছনে নামায পড়ছি। হ্যাঁ আল্লাহ যাদেরকে রহম করেন। আমাদের কোন ভাই খুৎবা আরম্ভ করে দেয়, অথচ তার এক বা দুই বা তিনটি আয়াতই মুখস্ত আছে, অতঃপর খুৎবা বন্ধ করে নামাযের দিকে মনোযোগী হয়।

কিছু মুসল্লি অনুভব করে না, যে নামায বিনয়ী সাথে পড়তে হয়। ইমামকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে, চোখ বাঁকা করে পেছনের দিকে তাকায়, কোন মুসল্লি পাশে দাড়ালে তার দিকে দৃষ্টি দেয়। জামা-কাপড় নিয়ে খেলা করে, অথবা কাপড়ে ধুলা লাগলে তা পরিষ্কার করে। হাতের ঘড়ির দিকে তাকায়, আবার মসজিদের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হাতের ঘড়ি দেখে যে, সময় বরাবর ঠিক আছে কিনা। এমন আরো অনেক কর্মকাণ্ড করে থাকে, যা নামাযে করা উচিত নয়। এভাবে নামায পড়েই তারা আনন্দিত, তারা ভাবে না যে মহান সৃষ্টিকর্তার সামনে তারা নামায পড়তে দাঁড়িয়েছে।

04 أوخ উউউউহহহহ উউউউহহহহ উউউউহহহহ পবিত্র কুরআনের কিছু কিছু আয়াতে রহমত, জান্নাত ও বিশেষ নিয়ামতের কথা বলা হয়েছে। মুমিনগণ সেগুলোর অপেক্ষায় রয়েছেন। আর কিছু আয়াত রয়েছে যার মধ্যে জাহান্নামের শাস্তি, পরকালের আলোচনা করা হয়েছে। মুসল্লিগণ এসব আয়াত শোনার সময় আল্লাহর ভয়ে, জাহান্নামের ভয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। মাঝে মধ্যে এমন কিছু মুসল্লি লক্ষ্য করা যায়, যে তারা প্রত্যেক নামাযেই এভাবে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন, চাই আয়াতগুলো জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কিত হোক কিংবা মাসিক ঋতু অথবা প্রসূতি সংক্রান্ত হোক। এগুলো মূলত অসচেতনতাই প্রমাণ করে।

দারিদ্রতা কোন দোষনীয় নয় এমনকি হারামও না। নামাযের মধ্যে অনেককেই চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয়ী দেখা যায়। তবুও তারা চেষ্টা করে উত্তম পোশাক পরিধান করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে মসজিদে যেতে। কিন্তু আশ্চার্যের বিষয় হলো অনেক কর্মজীবি লোককে দেখা যায় সাপ্তাহ ভরে কাজ করে মসজিদে আসে অপরিষ্কার অবস্থায়, শরীরের তেলের গন্ধ, ঘামের গন্ধ, সিমেণ্ট লেগে রয়েছে। অযু করার সময় শরীরে সামান্য পানি ছিটা দিয়েই মসজিদে প্রবেশ করে। আর বলে থাকে কাজের ঝামেলায় পরিষ্কার করার সুযোগ পাইনা, আরো বলে দ্বীন তো সহজ।

1111কিছু মুসল্লি রয়েছেন যারা ইমামের সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গে মসজিদ থেকে বের হওয়ার জন্য উদ্যত হন। তারা এ কথা চিন্তাই করেন না যে, এখনও অনেক মুসল্লি নামায শেষ করেন নাই। অথচ নামাযীর সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করা জায়েয নাই। কিন্তু এই দ্রুতগামী দশ দশ জন মুসল্লির সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করছে, কেউ যদি তাকে বাঁধা দেয়, সে রাগ করে। আর কেউ কেউ মনে করে যে, ধীরগতিতে মুসল্লির সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করলে তা বৈধ হবে (যা মোটেও বৈধ নয়)। আল্লাহ সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন।

نظر فوقরাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়া অবস্থায় দৃষ্টি উপরের দিকে নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেছেন। বরং যারা সর্বদা উপরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাদের দৃষ্টিশক্তি আল্লাহ বিলুপ্ত করে দিবেন, এমন হুঁশিয়ারি বক্তব্য আল্লাহর রাসূল প্রদান করেছেন। তিনি এ কথা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, নামাযী ব্যক্তির দৃষ্টি দাঁড়ানো অবস্থায় সেজদার জায়গায় থাকবে। কিন্তু কিছু মুসল্লি নামাযে রুকু থেকে দাঁড়ানোর সময় ছাদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে থাকে, তারা মনে করে এটাই সঠিক, যেন তারা আল্লাহর দিকে তাকাচ্ছেন, আর আল্লাহ তাদেরকে সম্বোধন করছেন। (আল্লাহ আমাদের সবাইকে এমন দৃষ্টি নিক্ষেপ করা থেকে হেফাযত করুন)

آمينউচ্চ স্বরে কিরাত বিশিষ্ট নামাযে ইমামের পেছনে আমীন বলা এটি উত্তম সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূলের উম্মতকে আমীন বলার কারণে ভালোবাসেন। আর ফেরেশতাগণও জামাতের মুসল্লিগণের সঙ্গে আমীন বলেন। আর যে মুসল্লির আমীন বলা ফেরেশতার আমীন বলার সঙ্গে এক হয়ে যায়, আল্লাহ চাহে তো তার গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। তবে শর্ত হলো মুসল্লিদের আমীন ও ফেরেশতার আমীন বলা এক সঙ্গে শোনা যেতে হবে। দুঃখজন হলেও সত্য যে, কিছু মুসল্লি এমন রয়েছেন যে তারা ইমামের আমীন বলার সঙ্গে সঙ্গে বলেন না, বরং দেরী করে বলেন। অথবা এমন লম্বা করেন যে সমস্ত মুসল্লিদের আমীন বলা শেষ হয়ে যায় কিন্তু তিনি “আ” বলে টেনেই যাচ্ছেন।

নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় হাত বাঁধার সঠিক নিয়ম হলো সীনার নিচে ও নাভির উপরে, ডান হাত বাম হাতের উপরে রাখবে। কিন্তু অনেক লোককে দেখা যায়, তারা নাভির নিচে হাত বাঁধে, আবার অনেকে সীনার উপরে গলার কাছাকাছি হাত বেঁধে থাকে। অথবা অস্বাভাবিকভাবে হাত বাঁধে, সেইভাবে অন্য কাউকে বাঁধতে দেখা যায় না।

অনেকে একদিনে বার বার অযু করা পছন্দ করেন না। এই অবস্থাটি জামায়াতের সঙ্গে নামায অপেক্ষা একাকী নামায পড়ার মধ্যে বেশি পরিলক্ষিত হয়। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেশাব পায়খানা চেপে রেখে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন। সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ অমান্য না করে বরং পেশাব পায়খানার জরুরত থেকে ফারেগ হয়ে নামায পড়লে, নামাযে একাগ্রতা সৃষ্টি হবে।

صف في الصلاةঅনেক সময় লক্ষ্য করা যায়, যে প্রতাপশালী লোকেরা নামাযের মধ্যে দাঁড়ানোর সময় সীসাঢালা প্রচীরের মত কাতার বন্দী হয়ে দাঁড়ায় না। বরং তাড়া দু’জনের মাঝে নিজের মর্যাদাকে বড় মনে করে দূরত্ব বজায়ে দাঁড়ান। আর এভাবে দাঁড়ানো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের নামাযের পরিপন্থি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন।

05

জামাতে নামায তথা সময় মত একই ইমামের পেছনে উপস্থিত মুসল্লিদের নিয়ে এক সঙ্গে নামায পড়া। কিন্তু বারবার একই সমস্যা পরিলক্ষিত হয়, প্রধান জামাতের পর একই সঙ্গে দুই জামাত হতে দেখা যায়। আর এটি হয়ে থাকে মুসল্লি দ্রুততার কারণে, এভাবে যে, একজন মুসল্লি দৌড়ায়ে এসে কিছু মুসল্লি নিয়ে মসজিদের একপাশে জামাত আরম্ভ করে দিল, অথচ একই সময় ওই মসজিদে দ্বিতীয় আরো একটি জামাত চলছে। দ্বিতীয় কারণ হলো: ইমাম সাহেবের স্বর এতই নিস্তেজ যে, অন্যরা শুনতেই পায় না। পরে আগত মুসল্লিগণ বুঝতেই পারেন নাই যে, মসজিদে জামাত চলছে।

06অনেক নামাযী রুকু অবস্থায় সঠিকভাবে রুকু করে না, রুকু অবস্থায় হাত দিয়ে অনেকে হাঁটুর অনেক নিচে গুড়ালীর কাছাকাছি ধরে আবার অনেকে হাঁটুর উপরে রানের মধ্যে হাত রাখে, আবার অনেকে একটু মাটি লাগলেই হাত দিয়ে ঝাড়া-ঝাড়ি করে। এমন ঘটনা বারবার পরিলক্ষিত হয়, এবং তারা বলেন যে এমন করা হয় নামাযে একাগ্রতা তৈরী হওয়ার জন্য। রুকু করার মানে এ নয় যে জামার মাপ দেওয়ার জন্য নিচ পর্যন্ত হাত দেওয়া। তবে হ্যাঁ কেউ যদি স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে সঠিকভাবে রুকু করতে না পারে, তাকে আল্লাহ মাফ করবেন।

তেমনিভাবে অনেক নামাযী ছবিতে দেওয়া সঠিক পদ্ধতিতে রুকু করে না। অনেকে সামান্য ঝুকে যা ৯০% ও হয় না। একে বারে পায়ের গুড়ালি পর্যন্ত ঝুকা, এটাও সঠিক না। এভাবে ঝুকাকে অনেকে নামাযের একাগ্রতা মনে করে।

05অনেক মুসল্লি সঠিকভাবে সেজদা আদায় করেন না, কনুই মাটির সাথে মিলায়ে সেজদা করেন, যা শুদ্ধ নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে সেজদা করাকে কুকুরের সাথে তুলনা করেছেন। তেমনিভাবে দুনো হাত কম্ফু, কেরাটির মত হাত মুষ্টি করে সেজদা করাও ঠিক নয়। বরং সঠিক নিয়ম হলো দুই হাতের আঙ্গুলগুলো মিলায়ে কিবলার দিকে সোজা রাখা, তেমনিভাবে পায়ের আঙ্গুলগুলোও কিবলার দিকে রাখা। তবে হ্যাঁ কেউ যদি স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে সঠিকভাবে রুকু করতে না পারে, তাকে আল্লাহ মাফ করবেন।

08অনেক মুসল্লি এমন আছেন যে, জামাত শেষ করার পর মসজিদেই গল্পগোজব শুরু করে দেন। তারা এ কথা ভুলে যান যে মসজিদে অবস্থান করছেন। অথচ অনেকে সুন্নত পড়ছেন, কিংবা অনেকে পরে এসে ফরজ আদায় করছেন। তারা মসজিদটাকে হোটেল বানিয়ে নেন। যদি তাদের থেকে বয়সে ছোট এমন ব্যক্তি বলেন; “মুরব্বীগণ আসতে কথা বলুন! এখানে অনেকে নামায পড়ছেন।” তখন তারা উত্তরে বলে; ‘আশ্চর্য! ছোট ছেলে আমাদেরকে উপদেশ দেয়, শিষ্টাচার বলতে কিছু নেই?’ তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস শুনান যে; যারা বড়দের সম্মান করেন না তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত না। আরো কত কি যে বলে!!!

صف في الصلاةজামাতের সঙ্গে নামাযের জন্য কাতার বন্দী হয় দাঁড়ানো যেন সীসা ঢালা প্রাচীরের মত মজবুত ও সোজা হয়। সকল নামাযীকে এভাবে দাঁড়ানো উচিত যে, দুই পা এবং কাঁধ যেন বরাবর হয়। কিন্তু অনেক মুসল্লি বিষয়টি না জানার কারণে সঠিকভাবে দাঁড়ায় না, দূরত্ব বজায় দাঁড়ানোর কারণে মাঝখানে শয়তান প্রবেশ করার সুযোগ পায়।

09

অনেকে পরে এসে জামাতে শরীক হয়, আর এত স্বরবে তাকবীরে তাহরীমা বাঁধে যেন সে ইমাম। এতে মুসল্লিদের সন্দেহ হয় যে ইমাম সাহেব কী তাকবীর বললেন? অনেকে রুকুতে কিংবা সেজদায় চলে যান। মুক্তাদীর জন্য এভাবে স্বরবে তাকবীর বলা কিংবা কেরাত পড়া সুন্নতের পরিপন্থি, এই মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম অথবা সাহাবা কেরামগণ থেকে কোন বর্ণনা প্রমাণিত নেই। আর নিয়তের স্থান হলো অন্তর, মুখে বলারও কোন প্রয়োজন নেই।

10

সাধারণত অনেক মুসল্লি এ বিষয়টি জানেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম কাঁচা পেঁয়াজ রশুন খেয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করেছেন। যেন অন্যান্য মুসল্লিদের কষ্ট না হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে অনেক মুসল্লিকে দেখা যায় তারা কাঁচা পেঁয়াজ, রশুন ও সিগারেট খেয়ে মসজিদে নামায পড়তে যান। এবং কাতারে দাঁড়িয়ে আ‘‘‘হ করে হাই তুলেন। বার বার করতেই থাকেন, যেন তিনি এভাবে হাই তুলাকে গর্ব মনে করছেন।

11কিছু মুসল্লি জামাতে নামায পড়তে দাঁড়িয়ে কাতার বন্দীকে ভেঙ্গে দেয়। এভাবে যে, ইমামের তাকবীর অপেক্ষা অনেক বিলম্ব করে, সে অন্যান্য মুসল্লি অপেক্ষা রুকু, সেজদায় দেরী করে। আর সে এতেই নিজেকে বেশি মুত্তাকী মনে করে। আর বাকী মুসল্লিগণ যেন ফাও দাঁড়িয়ে আছে। আসলে সঠিক নিয়ম হলো রুকু, সেজদা, এবং দাঁড়ানোসহ সবকিছুই ইমামের সঙ্গে সঙ্গে করা উচিত। যেন প্রকৃতভাবে নামাযটি জামাতের নামায হয়। আর যে ব্যক্তি নামাযে দীর্ঘ সেজদা করতে চায় সে যেন একাকী তথা নফল নামাযে করে।

12অনেক মুসল্লিদের দেখা যায়, যারা জুমুয়া কিংবা ফরয নামাযের জন্য বসে অপেক্ষা করা কিংবা খুৎবা চলা অবস্থায় পরস্পর কথা বলে, সালাম ও কোশল বিনিময় করে, অথচ জুমুয়ার খুৎবা নামাযেরই অংশ, খুৎবা চলা অবস্থায় কথা বলা হারাম। এ সময় তারা শিশু কিশোরদের উপদেশ দেয়, আবার অনেকে খতীব সাহেবের খুৎবা ব্যাখ্যা করেন। যেন মনে হচ্ছে তারা কোন মসজিদে না সিনেমা হলে আছে। অথচ সিনেমা হলেও এভাবে কথা বললে বের করে দিবে। আর আল্লাহর ঘর মসজিদে গিয়েও তারা সংযত হয় না। আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। আমীন

13

সাধারণত হাই তুললে অমনোযোগী ও ক্লান্তি বুঝায়ে থাকে। এগুলো হয়ে থাকে সাধারণত ঘুমের চাপের কারণে। বিষয়টি যে কারণেই হোক, যথা সাধ্য হাই দমাতে চেষ্টা করতে হবে। এ যাবৎ কাউকে এমন পাওয়া যায়নি যে সে পেশা হিসেবে হাই তুলে। কিন্তু এমন অনেক লোককে দেখা যায়, যারা নামাযের মধ্যে দাঁড়িয়ে সিংহের মত হা করে হাই তুলে।

14প্রথম কাতার পূর্ণ হওয়ার পর দ্বিতীয় কাতার আরম্ভ নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। কেউ মনে করেন নতুন কাতার ডান দিক থেকে আরম্ভ করা ভালো। কেননা সব কাজই ডান থেকে শুরু করা উত্তম। আবার কেউ বাম দিককে প্রাধান্য দেয়, কারণ প্রথম কাতার শেষ হয়ে বাম দিক দিয়ে। আবার কেউ ফ্যানের নিচে থেকেই কাতার শুরু করে দেন, কারণ তিনি গরম সহ্য করতে পারেন না। তবে উত্তম হলো ইমাম বরাবর পেছন থেকে নতুন কাতার শুরু করা।

15অনেক মুসল্লি মনে করেন যে, ইমাম সাহেবের সূরা ফাতেহা ও কিরাত পড়া মুসল্লিদের জন্য যথেষ্ট নয়। তারা মনে করেন কমপক্ষে সূরা ফাতেহা পড়তে হবে যেন নামায শুদ্ধ হয়। আসলে বিষয়টির মধ্যে অবকাশ ও মতভেদ রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো অনেক মুসল্লি ইমামের সঙ্গে সঙ্গে এত দ্রুত ও উচ্চস্বরে সূরা ফাতেহা পাঠ করে যে, সে কি পড়ছে নিজেও বুঝে না। আর পাশের মুসল্লিও ইমামের পড়া শুনতে পান না, তার শব্দের কারণে। ভেবে দেখুন যদি এমন কাণ্ড কয়েক জন মুসল্লি করে, তাহলে নামাযের অবস্থা কি হবে।

এগুলো সংগ্রহের উদ্দেশ্য হলো: আমাদের নামাযে সাধারণত যেসব ভুল হয়ে থাকে, তা থেকে মুসল্লিদের সংশোধন করা। আর যথা সম্ভব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামাযের মত নামায আদায় করার চেষ্টা করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদীস “তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখ সেভাবে নামায পড়” হাদীসটির আমল করা।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে সাংবাদিকতা

app_sphere_news

সংবাদ বলতে মুদ্রণজগৎ, সম্প্রচার কেন্দ্র, ইন্টারনেট অথবা তৃতীয় পক্ষের মুখপাত্র কিংবা গণমাধ্যমে উপস্থাপিত বর্তমান ঘটনাপ্রবাহের একগুচ্ছ নির্বাচিত তথ্যের সমষ্টি যা যোগাযোগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। আর ইসলামী সংবাদ হলো; মানবিক ও মনের কুপ্রবিত্তির বশীভূত না হয়ে মানব কল্যাণের জন্য সত্য সংবাদ পৌঁছে দেওয়া। এই মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন;

 ثُمَّ جَعَلْنَاكَ عَلَى شَرِيعَةٍ مِّنَ الْأَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاء الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

তারপর আমি তোমাকে দ্বীনের এক বিশেষ বিধানের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছি। সুতরাং তুমি তার অনুসরণ কর এবং যারা জানে না তাদের খেয়াল খুশীর অনুসরণ করো না।(সূরা জাসিয়া: ১৮)

মহান আল্লাহ অন্যত্র বলছেন:

فَلِذَلِكَ فَادْعُ وَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ وَلا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ

এ কারণে তুমি আহবান কর এবং দৃঢ় থাক যেমন তুমি আদিষ্ট হয়েছ। আর তুমি তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না (সূরা শুরা: ১৫)

সংবাদ সংগ্রহের সময় দৃষ্টিশক্তি প্রখর রাখতে হবে। যেনতেন লোক থেকে সংবাদ গ্রহণ করা যাবে। এই মর্মে  আল্লাহ তায়ালা বলেন:

 إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأٍ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ (6﴾   الحجرات

মুমিনগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত: তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও। (সূরা হুজুরাত: ৬)

আল্লাহর রাসূল বলেন:

  عن أبي هريرة عن النبي  كفى بالمرء كذباً أن يحدث بكل ما سمع “

فالحديث رواه مسلم في  “مقدمة صحيحه ” ( 1 / 107  نووي ) ، وأبوداود ( 4 / 298 / 4992 ) ، ابن حبان

মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য ইহাই যথেষ্ট, যা শুনবে তা যাচাই ছাড়া বর্ণনা করা। মুসলিম শরীফের ভূমিকা আবু দাউদ ৪/২৯৮ ইবনে হিব্বান, ১/২১৩ )

 

সংবাদের রোকনসমূহ

১। দর্শক বা শ্রতা 

২। সংবাদ

৩।সাংবাদিক

৪। মাধ্যম, (কাগজ, টেলিভিশন, ইন্টারনেট ইত্যাদি।

 

উৎপত্তি রহস্য

একটি সূত্র দাবী করছে যে,চতুর্দশ শতাব্দীতে নিউ শব্দের বহুবচন হিসেবে নিউজ বা সংবাদ শব্দটি বিশেষভাবে ব্যবহার করা হতো। মধ্যযুগীয় ইংরেজী হিসেবে নিউজ শব্দটির সমার্থক ছিল নিউইজ (newes), ফরাসী শব্দ নোভেলেজ (nouvelles) এবং জার্মান শব্দ নিউয়েজ (neues)

লোকমুখে‘নিউজ’শব্দটিকে বিশ্লেষণ করা হয়-এন (নর্থ) উত্তর, ই (ইষ্ট) পূর্ব, ডব্লিউ (ওয়েস্ট) পশ্চিম এবং এস (সাউথ) দক্ষিণ।

 

ইতিহাস

সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে সংবাদপত্রের সূচনা ঘটে। এর পূর্বে সংক্ষিপ্ত সরকারী ঘোষণা বা ইস্তেহার এবং রাজার আজ্ঞা প্রধান-প্রধান নগরগুলোতে প্রকাশিত হতো। প্রথম লিখিতভাবে সংবাদ বা খবরের ব্যবহার মিশরে সু-সংগঠিতভাবে প্রবর্তন হয়েছিল। খ্রীষ্ট-পূর্ব ২৪০০ বছর পূর্বে ফারাও শাসন আমলে বর্তমানকালের জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম কুরিয়ার সার্ভিসের আদলে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রসারনের উদ্দেশ্যে ডিক্রী বা আদেশনামা প্রচারের ব্যবস্থা করা হতো।

 

আধুনিক ইউরোপের শুরুর দিকে আন্তঃসীমান্ত এলাকায় পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধিকল্পে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে হস্তলিখিত সংবাদের কাগজ ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৫৫৬ সালে ভেনিস প্রজাতন্ত্রীয় সরকার প্রথমবারের মতো মাসিক নটিজি স্ক্রিট প্রকাশ করে।

১৮৪৭ সালের আগস্টের শেষভাগে রংপুর থেকে প্রকাশিত হয় সংবাদপত্র রঙ্গপুর বার্তাবহ। কুণ্ডির জমিদার কালী চন্দ্র রায় চৌধুরীর অর্থায়নে প্রকাশিত হয় এই পত্রিকা। সম্পাদক ছিলেন গুরুচরণ রায়। এটাই বাংলাদেশের বর্তমান প্রথম সংবাদপত্র। ১৮৫৭ সালের ১৩ জুন গভর্নর লর্ড ক্যানিং জারি করেন ১৫নং আইন। মুদ্রণ যন্ত্রের স্বাধীনতানাশক এ আইনে ১৮৫৯ সালে বন্ধ করে দেয়া হয় রঙ্গপুর বার্তাবহ। প্রকাশিত হওয়ার সময় থেকে পরের একযুগ সময় রঙ্গপুর বার্তাবহ মানুষকে সচেতন করার ক্ষেত্রে যে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলতা সত্যিই গর্ব করার মতো।

বিশ্বের প্রথম সংবাদ পত্র

১৬০৫ সালে প্রকাশিত রিলেশন অলার ফুর্নেমেন আণ্ড গেডেনঙ্কুরডিগেন হিস্টোরিয়েনকে বিশ্বের ১ম সংবাদপত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

 

 

সংবাদ চার প্রকার

১। ব্যক্তি নিজেই নিজের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবে। এটাকে ইত্তেসালে জাতি বলা হয়। যেমন

ويتفكرون في خلق السماوات والأرض ربنا ما خلقت هذا باطلا سبحانك فقنا عذاب النار

আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে। (বলে) হে আমাদের রব, তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করনি। তুমি পবিত্র মহান। সুতরাং তুমি আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা কর।

و في أنفسكم أفلا تبصرون

তোমাদের নিজদের মধ্যেও। তোমরা কি চক্ষুষ্মান হবে না?

سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ

বিশ্বজগতে ও তাদের নিজদের মধ্যে আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাব যাতে তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয় যে, এটি (কুরআন) সত্য;

فلينظر الإنسان مم خلق

অতএব মানুষের চিন্তা করে দেখা উচিৎ, তাকে কী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে ?

أفلا يتدبرون القرآن

তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না?

 

২। ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করবে। এটাকে ইত্তেসালে শাখসী বলা হয়। যেমন

و تعاونوا على البر و التقوى و لا تعاونوا على الإثم و العدوان

 

সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না।

يا أيها الذين آمنوا قوا أنفسكم و أهليكم نارا و قودها الناس و الحجارة *

হে ঈমানদারগণতোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর;

كلكم راع و كلكم مسؤول عن رعيته

৩।আমরা সকলেই জানি যখন আল্লাহ তায়ালা  وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ অবতীর্ণ করলেন,তখনই রাসূল (সা.) হযরত খাদিজা, আলী, যায়েদ ইবনে হারেসা, ও আবু বরকরের নিকট সংবাদটি পৌঁছায়ে দিলেন। এমন সংবাদকে ইত্তেসালে জামঈ বলা হয়।

 

 ৪। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা অবতীর্ণ  করলেন  وأعرض عن المشركين فاصدع بما تؤمر  সুতরাং তোমাকে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে, তা ব্যাপকভাবে প্রচার কর এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। তখন রাসূল (সা.) সাফা পর্বতেচড়ে মক্কার কাফেরদের দাওয়াত দেন।বাজারে বাজারে ঘুরে ঘুরে দাওয়াত দেন। তায়েফের ময়দানে দাওয়াত দেন। বাইয়াতে আকাবাতে দাওয়াত দেন। মক্কা-মদীনায় সারা জীবন দাওয়াত দেন। এমন দাওয়াত বা সংবাদকে ইত্তেসালে জামাহীর বলা হয়।

 

মিথ্যা সংবাদ প্রচারের পরিণতি:

وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ [النور : 4

আর যারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করেতারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে নাতবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক।

فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ) [الحج: من الآية 30

সুতরাং মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বিরত থাক এবং মিথ্যা কথা পরিহার কর।

  وَلا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ وَمَنْ يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آثِمٌ قَلْبُهُ )(البقرة/283)

আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না এবং যে কেউ তা গোপন করেঅবশ্যই তার অন্তর পাপী।

 

وقال تعالى في صفات المؤمنين:وَالَّذِينَ لا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَاماً[الفرقان:72].

আর যারা মিথ্যার সাক্ষ্য দেয় না এবং যখন তারা অনর্থক কথা-কর্মের পাশ দিয়ে চলে তখন সসম্মানে চলে যায়।

وقال النبي صلى الله عليه وسلم: ”ألا أنبئكم بأكبر الكبائر –ثلاثاً- قلنا: بلى يا رسول الله. قال : “الإشراك بالله وعقوق الوالدين” وكان متكئاً فجلس فقال: “ألا وقول الزور، ألا وشهادة الزور فما زال يكررها حتى قلنا: ليته سكت. يعني قال الصحابة: ليته سكت”. رواه البخاري ومسلم

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আমি কি তোমাদেরকে কবীরা গুনাহ সম্পর্কে সংবাদ দেব না? (কথাটি রাসূল (সা.) তিনবার বলেছেন) সাবাহায়ে কেরামগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! বলুন, তিনি বললেন: আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, মাতা পিতার অবাধ্য হওয়া, কথাগুলো বসার সময় রাসূল (সা.) হেলান দিয়ে বসেছিলেন, অতঃপর সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেন, মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। কথাগুলো বারবার বলতেছিলেন। আমরা (সাহাবাগণ) মনে মনে বলতেছিলাম, হায়! যদি তিনি চুপ হতেন। (বুখারী ও মুসলিম)

 

من قال علّيَّ ما لم أقل ، فلْيتبوَّأ مقعده من النار (مسلم)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন: নিজে বলে, এ কথা বলা যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নিলো। (মুসলিম)

মিথ্যা সংবাদ প্রচারকারীর ঠিকানা জাহান্নাম:

  شهادة الزور توجب لصاحبها النار

সহীহ সনদে ইমাম হাকেম বর্ণনা করেন: মিথ্যা সংবাদ পরিবেশণকারীর ঠিাকানা জাহান্নাম।

মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করা ও শুনা থেকে হিফাযত করুন। আমীন

বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

উপক্রমণিকা: ঈসায়ী ৭ম শতকের পৃথিবী। সর্বত্র যুদ্ধ রক্তপাত আর হানাহানি। ব্যক্তি পরিবার সমাজ রাষ্ট্র সর্ব ক্ষেত্রেই ছিল নৈরাজ্য আর অশান্তি। শান্তির দূরতম লক্ষণ কোথাও দৃষ্টিগোচর ছিলোনা। মানবতার ও সভ্যতার এহেন অশান্তিময় দুরবস্থায় এলেন মহানবী (সা.)।পেশ করলেন শান্তির বাণী। মাত্র ২৩ বছরের মধ্যে তিনি তদানীন্তন আরবে এক শান্তিময় রাষ্ট্র স্থাপন করলেন। প্রশস্ত করে দিলেন মানবতার শান্তির স্বর্গীয় অনুপম পথ। সমগ্র মানবজাতি খুঁজে পেয়েছিলো শান্তির দিকনির্দেশনা। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে যুগ যুগ ধরে চলে আসা যুদ্ধের অবসান ঘটে ছিলো আরবে। চরম অশান্তির বদলে স্থাপিত হয়েছিলো সুখের আবাস। নিষ্পেষিত শোষিত মানবতা খুঁজে পেয়েছিলো শান্তির অমিয়ধারা। আর প্রত্যক্ষ করেছিলো শান্তিময় সুশীল সমাজরাষ্ট্র। বিশ্ববাসী লাভ করেছিলো শান্তির পরশ। স্বর্গীয় শান্তির ফল্গুধারা নেমে এসেছিলো ধূলির এধরায়। শান্তিময় হয়ে ওঠেছিলো সবকিছু। শান্তির সুবাতাস বয়ে চলছিলো বিশ্বজুড়ে। এভাবে মহানবীর শিক্ষা সংস্কার ও সমাজ বিনির্মাণে মূর্ত হয়ে ওঠেছিলো সে দিন।

একি শুধু অতীতের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের এক দ্যুতিময় অধ্যায় ? নাকি আজকের সংকট সমস্যা জর্জরিত পৃথিবীতে এর কোন উপযোগিতা আছে ? আদর্শিক শূন্যতা হতাশা ও নিশ্চয়তার অতল গহবরে নিক্ষিপ্ত মানবতার মুক্তির সাধনে মহানবীর (সা.) জীবনাদর্শ কী অতীতের মতোই দিক নির্দেশনা দিতে সক্ষম ? যুদ্ধে জর্জরিত পৃথিবীতে শান্তি ও ন্যায়ের নিশ্চয়তা দানে সে আদর্শ আজোকী সমক্ষ ?
এজন্যে আজ মহানবীর (সা.) আদর্শকে বিশেষভাবে অনুশীলন ও চর্চা একান্ত প্রয়োজন। প্রয়োজন আজকের সংকটাপন্ন পৃথিবীতে তাঁর আদর্শের সক্ষমতাদানের বিচার-বিশ্লেষণ। কারণ তিনি বিশ্ব মানবের জন্য ছিলেন শান্তির অগ্রদূত। বিরাজমান সংকট দূরীকরণে তাঁর আর্দশের বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তা সামনে রেখে আলোচনার প্রয়াস মাত্র।
আল্লাহ বলেন; আমার সৃষ্টিকুলের সবার জন্য আপনাকে শান্তির অগ্রদূত হিসাবে প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)
হাদীস অধ্যয়ন করলে জানা যায়, যে মহানবী (সা.) সকলের জন্যই শান্তির অগ্রদূত ছিলেন।
জনৈক সাহাবী রাসূলকে (সাঃ) মুশরিকদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করার জন্য বললে নবীজী উত্তরে বলেন ; আমাকে এ জন্য প্রেরণ করা হয়নি যে আমি কাউকে অভিশাপ দেবো, বরং আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে রহমত (শান্তির অগ্রদূত) স্বরূপ। মুসলিম আবু হুরায়রাহ থেকে।
নবীজী ছিলেন দয়ার সাগর এবং উম্মতকেও দয়া ও কোমলতা শিক্ষা দিয়েছেন, স্বয়ং আল্লাহই নবীজীকে তাঁর সাহাবাদের সাথে কোমলতার কথা তোলে ধরেছেন এ ভাবে; মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল, আর যেসব লোক তাঁর সঙ্গে রয়েছে তাঁরা কাফেরদের প্রতি শক্ত কঠোর, এবং পরস্পর পূর্ণদয়াশীল। (সূরা ফাতহ: ২৯)
মূলত নবীজীর এই কোমলতাই মুশরিকদের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হয়েছে। যদি তিনি কঠোরমনা হতেন তাহলে লোকেরা তাঁর কাছেই ঘেঁষতো না। আল্লাহ বলেন; হে নবী এটা আল্লাহর বড়ই অনুগ্রহের বিষয়, যে তুমি লোকদের জন্য খুবই নম্র স্বভাবে হয়েছো। অন্যথায় যদি তুমি উগ্র-স্বভাব ও পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী হতে , তাহলে এসব লোক তোমার কাছেই ঘেঁষতো না। ( সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)
আর এই মর্মে নবীজী বলেন; যেব্যক্তি কোমল স্বভাব থেকে বঞ্চিত সে কল্যাণ থেকেও বঞ্চিত। রাসূলে (সা.) সাহাবাদের শান্তির দিকে উৎসাহ দিতে গিয়ে বলেন; মহান দয়ালু আল্লাহ দয়াকারীদের প্রতি দয়া করে থাকেন, সুতরাং তোমরা দুনিয়াবাসীদের প্রতি দয়া কর , তাহলে যিনি আকাশে আছেন তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।
সুতরাং আমাদের উচিত নবীজীর আদর্শকে আঁকড়ে ধরা আর দয়া ও স্নেহ মায়া-মমতা দিয়ে সকলকে আপন করে নেওয়া। এই কাজটি আমরা দুভাবে আমাদের জীবনে প্রকাশ করতে পারি। ১. ছোটদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শন , আর ২. বড়দেরকে সম্মান দিয়ে।
মহানবী ছিলেন পরমসহিষ্ণু। সামাজিক যে কোন কাজে তিনি সাহাবায়ে কেরামদের পরামর্শ চাইতেন। নিজের মতের সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য দেখা দিলেও তিনি অধিকাংশের মতের প্রধান্য দিতেন। আল্লাহর বাণী প্রচার করতে গিয়ে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ অকথ্য জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁরা সেজন্য নিজ নিজ স¤প্রদায়ের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট বদদোয়া করেছেন। নবীগণের বদদোয়ায় আল্লাহ সেসব স¤প্রদায়কে ধ্বংস করে দিয়েছেন। মহানবী (সা.) তায়েফের প্রান্তরে প্রস্তরাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন। মালায়েকা তাঁর নিকট পাহাড় চাপা দিয়ে তায়েফবাসীদের ধ্বংস করে দেওয়ার অনুমতি চয়েছেন। অহুদের যুদ্ধে নবীজী মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। তাঁর পবিত্র দাঁত ভাংগা গেছে। লৌহ শিরস্ত্রাণ ভেঙ্গে মাথায় ঢুকে গেছে। নবীজীর দুঃখে অহুদ পাহাড় আরজ করলো আপনি অনুমতি দিন আমি কাফিরকুলকে গ্রাস করে ফেলি। মহানবী (সা.) এ অনুমতি দেননি। তিনি আল্লাহর কাছে বিনয়াবনত মস্তকে আরজ করলেন; হে আল্লাহ আমার স¤প্রদায়ের লোকেরা অবুঝ! ওদের হেদায়েত দিন।
তিনি ছিলেন ধৈর্যের প্রতীক। শান্তির পতাকাবাহী, ও মহানায়ক। এক কথায় তিনি ছিলেন আদর্শ বালক , আদর্শ যুবক, আদর্শ সেবক, আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক, আদর্শ মহাবিজ্ঞানী, পৃথিবীর যে কোন মানুষের জন্য তিনি ছিলেন আদর্শ শিক্ষক, তিনি ছিলেন সকল বিষয়েরই আদর্শ নমুনা বা মডেল। তাঁকে নিয়ে পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে আলোচনা গবেষণা হয়েছে , হচ্ছে এবং হতে থাকবে। তিনি বহুল আলোচিত ব্যক্তি। সর্বকালে সকল বিষয়ে তিনি শীর্ষে স্থান পেয়েছেন এবং পেতে থাকবেন। তিনি সর্বজন বরেণ্য। এজন্যই তাঁর পদাংক অনুসরণ সকলের জন্য ফরজ। আল্লাহ বলেন; আর রাসূল তোমাদের যে বিষয়ে আদেশ করেন, তা পালন করবে, এবং যে সব বিষয়ে বারণ করবেন অবশ্যই তা থেকে বিরত থাকবে। (সূরা হাশর: ৭)
নবীজী তাঁর গোটা জিন্দেগীতে যে সব কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করেন তা সংক্ষেপে নিম্মে পেশ করছি।
* কর্মধারাঃ তাঁর আচরণে মুগ্ধ সবাই। সচ্চরিত্রের অধিকারী “আল-আমীন” বলে ডাকতে বাধ্য সবাই। প্রায় যৌবনে পদার্পণ। সুশীল সমাজ বিনির্মাণে দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে মক্কায় বর্ণ-গোত্রের সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে গড়ে তুলেন সামাজিক সংগঠন “হিলফুল ফুযুল”।
* সমাজ গঠনঃ হিযরতের পর মহানবী (সা.) প্রথমে মক্কা থেকে আগত মুহাজির এবং মদীনার আনসারদের মধ্যে স্থাপন করলেন ভালোবাসার ভরপুর ভ্রাতৃত্ব যা ইতি পূর্বে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রত্যক্ষ করা যায়নি। কিছু দিনের মধ্যে মদীনার সমাজকে রাষ্ট্রে পরিণত করার উদ্যোগ নিলেন মহানবী (সা.)।
* সংখ্যালঘুর অধিকার : তদানীন্তন মদীনাতে তথা সমগ্র পৃথিবীতে সংখ্যালঘুদের কোন অধিকার কার্যত ছিলো না। কিন্তু মহানবী (সা.) এমন আদর্শ স্থাপন করেছিলেন যা আজো মনবতা পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পারেনি। এ ব্যাপারে তিনি কয়েকটি মূলনীতি পেশ করেছিলেন। তা হচ্ছে;
১. নিজ নিজ ধর্ম বিশ্বাস।
২. বিবেকের স্বাধীনতার অধিকার দেওয়া।
৩. ধর্মীয় ব্যাপারে কারো মনে কষ্ট দেওয়া যাবে না।
৪. ব্যক্তি অপরাধে সমাজের অপরাধ নয়।
৫. আইনের চোখে সবাই সমান।
প্রেক্ষিতে আজকের বিশ্ব : হাজারো সমস্যা আবর্তে আজকের বিশ্ব মানবতা আজ নিষ্পেষিত। জাতিতে জাতিতে সংঘর্শ আজ সর্বত্র। সাম্রাজ্যবাদের ছোবলে পড়ে ছোট ও গরীব রাষ্ট্রগুলো আজ দিশেহারা। সর্বত্র চলছে আজ ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত, জাতিগত প্রধান্যের তীব্র প্রতিযোগিতা। ফলশ্র“তিতে সংঘাত , অসাম্য, ঘৃণা, প্রতিশোধ, আজ প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুসলিম দুনিয়ার অবস্থা আরো ভয়াবহ। অব্যবস্থা, দারিদ্র, স্বৈরাচারী শাসন মুসলিম বিশ্বের আজ বৈশিষ্ট। মুসলমানরা আজ সাম্রাজ্যবাদ ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্রের কবলে নিপতিত। সর্বত্র মুসলমানেরা নির্যাতিত, বঞ্চিত, নিগৃহিত। কসোভা, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আরাকান, বসনিয়া, সর্বত্রই মুসলমানের রক্তের হোলিখেলা চলছে। অনৈক্য, বিভেদ মুসলিম বিশ্বের শক্তিকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। আবার এই অনৈক্য বিভেদে ইন্ধন যোগাচ্ছে পাশ্চাত্য।
উপসংহার
তাই এহেন দূরবস্থা থেকে গোটা বিশ্ব আজ মুক্তি পেতে চায়। কিন্ত সে বাঁচার পথ কোনটি ? আজ বিশ্বমানবতার সামনে মুক্তির পথ উম্মুক্ত নয়। তাই আজকের প্রেক্ষিতে মহানবীর জীবনাদর্শের চর্চা ও অনুশীলন যত বেশী হবে ততই মানবতার মুক্তির পথ উম্মুক্ত ও সুগম হবে। আমাদের ব্যষ্টিক সামাজিক জীবনকে করবে শোষণ মুক্ত সমৃদ্ধিশালী। রাষ্ট্রকে করবে শক্তিশালী, পরিবারকে করবে প্রেমময়। গোটা মানবতাকে দেখাবে মহা ঐক্যের মহাভ্রাতৃত্বের সন্ধান। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব পতনের পথ থেকে মুক্তি পাবে। অতীতের সোনালী যুগ আবার তারা উদ্ধার করবে,বিশ্ব মুসলিম জাগরণের পথ হবে প্রশস্ত।
بلغ العلى بكماله * كشف الدجى بجماله
حسنت جميع خصاله * صلوا عليه و آله
اللهم صل و سلم دائماً أبداَ

সর্বশেষ যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে

সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী
সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী

পুলসিরাত সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ হাদীসের শেষাংশে এসেছে : হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত এক ব্যক্তি জাহান্নামের দিকে মুখ করা অবস্থায় থাকবে। তখন সে বলবে, হে আমার প্রভূ! জাহান্নামের গরম বায়ু আমাকে শেষ করে দিল। আমার চেহারাটা আপনি জাহান্নাম থেকে অন্য দিকে ফিরিয়ে দিন। সে এভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে বার বার প্রার্থনা করতে থাকবে। আল্লাহ তাকে বলবেন, তোমার এ প্রার্থনা কবুল হলে এরপর তুমি যেন আর কিছু না চাও। সে বলবে, আপনার মর্যাদার কসম করে বলছি, এরপর আপনার কাছে আর কিছু চাইবো না। তখন জাহান্নামের দিক থেকে তার চেহারা ফিরিয়ে দেয়া হবে। তারপর সে আবার বলতে শুরু করবে, হে আমার প্রভূ! আমাকে একটু জান্নাতের দরজার নিকটবর্তী করে দেন। আল্লাহ বলবেন, তুমি কি বলোনি এরপর আর কিছু চাইবে না? ধিক হে মানব সন্তান। তুমি কোন কথা রাখো না। কিন্তু এ ব্যক্তি প্রার্থনা করতেই থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমার তো মনে হয় তোমার এ দাবী পুরণ করা হলে আবার অন্য কিছু চাইবে। সে বলবে, আপনার মর্যাদার কসম করে বলছি, এরপর আপনার কাছে আর কিছু চাইবো না। সে আর কিছু চাইবে না এ শর্তে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের গেটের নিকটবর্তী করে দিবেন। যখন সে জান্নাতে গেটের দিকে তাকিয়ে জান্নাতের সূখ শান্তি দেখবে তখন কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার প্রার্থনা করতে শুরু করবে, হে আমার প্রভূ আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ বলবেন, তুমি কি বলোনি এরপর আর কিছু চাইবে না? ধিক হে মানব সন্তান! তুমি কোন কথা রাখো না। সে বলবে, হে আমার প্রভূ! আমাকে আপনার সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে দুর্ভাগা করে রাখবেন না। এভাবে সে প্রার্থনা করতে থাকবে। অবশেষে আল্লাহ হাসি দিবেন। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর পর আল্লাহ বলবেন; ঠিক আছে তুমি আরো কিছু চাও, সুতরাং সে আল্লাহর নিকট চাইবে, আল্লাহও তাকে বিভিন্ন বিষয় চাওয়ার জন্য স্মরণ করিয়ে দিবেন। অতঃপর তার চাওয়া শেষ হয়ে যাবে। আল্লাহ বলবেন এই সবই তোমার জন্য। এবং সাথে আরো সেই পরিমাণ দেওয়া হলো। (বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)